তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেভাবে শুরু হয়েছিল
দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের পর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ সুগম হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের সিদ্ধান্তও বহাল রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দেন। রায়ের বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি জানান, পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চেয়ে করা আবেদনসহ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা সব আপিল খারিজ করেছেন আপিল বিভাগ। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিস্তারিত জানা যাবে। রায় ঘোষণার সময় আদালত কক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
যেভাবে শুরু হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্ম হয় রাজনৈতিক আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
তবে ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠার পর দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়—এ দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো আন্দোলন শুরু করলে ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য দায়িত্ব নেবে এবং ওই সময়ের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব হয়েছিল।
২০০৬ সালের সংকট ও ওয়ান-ইলেভেন
২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। বিচারপতি কে এম হাসানকে নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে দেশজুড়ে সংঘাত বাড়ে। একপর্যায়ে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়, যা ‘ওয়ান-ইলেভেন সরকার’ নামে পরিচিত।
এই সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল এবং নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্বের বাইরেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় বলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
যেভাবে বাতিল হয়েছিল ব্যবস্থা
২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অগণতান্ত্রিক।
এরপর একই বছরের ৩০ জুন আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা, সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিধান, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা বৃদ্ধি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সরকারি কার্যালয়ে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ও ছিল।
হাইকোর্টের রায় ও আপিল
২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল করেন। এর মধ্যে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপের বিধান এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত।
এই রায়ের বিরুদ্ধে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার নাগরিক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) পৃথকভাবে আপিল করেন।
আপিল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। বদিউল আলম মজুমদারসহ চার নাগরিকের পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া ও ব্যারিস্টার রেদওয়ানুল করিম। জামায়াতের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। এইচআরএসএসের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক এবং মো. মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। এছাড়া ইন্টারভেনার হিসেবে ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক ও ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন শুনানিতে অংশ নেন। আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ সুগম হয়েছে।