০২ জুলাই ২০২৬, ১৩:২১

নজরুল বর্ষের অনুষ্ঠানে অতিথি কমিশনার-নির্বাহী কর্মকর্তারা, উপেক্ষিত নজরুল গবেষক-শিল্পীরা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  © টিডিসি ফটো

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পরিবর্তে নজরুল গবেষক, শিল্পী ও নজরুলপ্রেমীদের সম্পৃক্ত না করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের মতো আয়োজনের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল উপস্থিতির চেয়ে নজরুলচর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সম্পৃক্ততাই বেশি যৌক্তিক ও উদ্দেশ্যসঙ্গত হতো। একই সঙ্গে তিনি নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও মানবিক চেতনাকে সরকারি দপ্তরের চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে গিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারাদেশে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’ উদযাপন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি স্মারক ডাকটিকিট এবং ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’-এর লোগোও উন্মোচন করেন।

অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছে, ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’। এর পরিবর্তে যদি লেখা থাকত, ‘সকল বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী, নজরুলপ্রেমীগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’, সেটি বরং বেশি যৌক্তিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো বলে আমার বিশ্বাস।’

তিনি বলেন, 'আমার এই উপলব্ধির কারণ হলো, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কিংবা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ অনুষ্ঠানে যদি বলা হয়, ‘নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী, নজরুলপ্রেমী মানুষেরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’, এটি যেমন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না, ঠিক একইভাবে, একই কারণে নজরুল বর্ষ উদযাপনে ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ কথাটিও উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ না করলেও তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯১৪ সালে কিশোর বয়সে নজরুল প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তিনি বলেন, বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত ও পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার এবং সব ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। বিপ্লব, বিদ্রোহ, রণসংগীত, ইসলামী মূল্যবোধের গান, ভজন-কীর্তন, শ্যামাসংগীত, প্রেম, প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।

তিনি আরও বলেন, মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও নজরুল আমাদের অন্যতম প্রধান দিশারি। আমাদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তার রচনায় মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে। কবির সৃষ্টিশীলতায় রয়েছে সব কালের, সব মানুষের জন্য আতিথ্য। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি আজও অনুপ্রেরণা। তার প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরাবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের কবিতা ও গান যেমন অনুপ্রেরণার শক্তিশালী উৎস ছিল, তেমনি দেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টিশীলতাই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা। তিনি বলেন, শুধু অতীত নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও নজরুল সমান প্রাসঙ্গিক। সে কারণেই জাতীয় কবির জীবন ও কর্মের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক আরও গভীর করতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তা, নজরুল গবেষক ও শিল্পীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি আধুনিক আবদ্ধ ঘরে বসে আজ যেভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করছি, স্মারক ডাকটিকিট এবং লোগো উন্মোচন করছি, এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিকে আমি একটু ভিন্নভাবেই আশা করেছিলাম।’

তিনি বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্র ও সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যারা সমাজ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও মনোজগতে গভীর প্রভাব রেখে যান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। কৈশোর থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তার প্রভাব অপরিসীম।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন জ্ঞানের দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি মূল্যবোধ হারিয়ে বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি নজরুলের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখী। সবার আগে কুসুম বাগে ,উঠবো আমি ডাকি’। ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে , দেখবো এবার জগৎটাকে। কেমন করে ঘুরছে মানুষ , যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে’—এ ধরনের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কবিতা ও ছড়া নতুন প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কবি নজরুলকে নিয়ে আলোচনা মন্ত্রণালয় বা সরকারি অফিসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ না রেখে তার সাহিত্য, জীবনবোধ, চিন্তা ও দর্শন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি নজরুলের ‘অভয়-সুন্দর’ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, 'আমি গেলে যারা আমার পতাকা ধরিবে বিপুল বলে—  সেই সে অগ্রপথিকের দল এসো এসো পথতলে।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের মাধ্যমে সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুলসংগীতের আসর, প্রকাশনা, নাট্যোৎসব ও চিত্রপ্রদর্শনীর মতো নানা আয়োজনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে তার সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচারের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশে নজরুল বিশেষজ্ঞ ও নজরুলপ্রেমীদের নিয়ে গঠিত ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’র মাধ্যমে দেশের সব জেলা, উপজেলা এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বছরজুড়ে প্রতিটি অনুষ্ঠান সফলভাবে পালন করা জরুরি বলে আমি মনে করি। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক গবেষক সমাজের কাছে নজরুলের সাহিত্যকর্ম আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে যাবে। তার বিশ্বজনীন মানবিক বার্তাও বহুভাষিক অনুবাদ ও গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।’

জাতীয় কবিকে নিজের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা নজরুল বিশেষজ্ঞ তারা কবিকে নানা বিশেষণে ভূষিত করেন। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’।’

তিনি নজরুলের ‘গাহি সাম্যের গান,  সেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,  সেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান’—পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা থাকলেও মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের চিরায়ত মূল্যবোধ। বর্তমান সরকারও এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বসবাস করবে। শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, কোনো প্রাণীও যেন মানুষের হিংস্রতার শিকার না হয়, সরকার সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।

সবশেষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবিক চেতনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে। আয়োজনকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে এবং ‘নজরুল বর্ষ’-এর সার্থকতা কামনা করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।’

সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। অনুষ্ঠানে দেশের নজরুল গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পীরাও অংশ নেন।