২০ জুন ২০২৬, ১৫:১৩

বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ  © টিডিসি ছবি

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) গ্রেফতারকৃত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (২০ জুন) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে কর্তব্যনিষ্ঠা, সাহসিকতা এবং জনহিতকর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ চারটি বিশেষ ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশের ১৫ জন সদস্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার, সনদ ও আর্থিক সম্মানী প্রদান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা জানান। 

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে ইউএই ফেডারেল পুলিশ কর্তৃক আসামিকে গ্রেফতারের পর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য ৩০ দিন সময় দেওয়া হলেও, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাত্র তিন দিনের মধ্যে ১৪৪ পৃষ্ঠার সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত ও অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে ইউএই সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। 

বর্তমান সরকারের কাজের গতি বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুততর উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির ফেডারেল এনসিবি ইমেইলের মাধ্যমে আমাদের এনসিবিকে জানায় যে, বাংলাদেশের অনুরোধে ইস্যুকৃত রেড নোটিশের ভিত্তিতে তারা ওই আসামিকে গ্রেফতার করেছে। তারা পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানোর অনুরোধ জানায়। সেটি আমরা (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) মাত্র তিন দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি।

মন্ত্রী পুরস্কৃত হওয়া ট্রাফিক কনস্টেবল মোহাম্মদ কামরুজ্জামানসহ (জলাবদ্ধতা নিরসনে নিজস্ব উদ্যোগে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করার জন্য ২০,০০০ টাকা ও আইজিপি ব্যাজ প্রাপ্ত) মোট চারটে চাঞ্চল্যকর ও প্রশংসনীয় ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। এসব ঘটনায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫জন পুলিশ সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়। 

তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় 'পানিশমেন্ট অ্যান্ড রিওয়ার্ড' (শাস্তি ও পুরস্কার) নীতি কার্যকর করেছে। কর্তব্যকাজে আন্তরিকতা ও সততা প্রদর্শনকারীদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি নিষ্ক্রিয়তা, গাফিলতি বা দুর্নীতিতে লিপ্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

মোহাম্মদপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অপরাধ প্রবণতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, নির্দিষ্ট কিছু এলাকা রাতারাতি অপরাধমুক্ত করা সম্ভব না হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করে অপরাধীদের নির্মূল করা হবে।

বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের স্বচ্ছতা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গাজীপুরের সাবেক কমিশনার ড. নাজমুল করিম খানের সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি আইনি ও বিভাগীয় বিধিমালা অনুযায়ী প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি চট্টগ্রামে জাতীয় ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হেনস্তা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে তদন্ত সম্পন্ন করে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর এবং ওসির বিরুদ্ধে প্রত্যাহার ও সাময়িক বরখাস্তসহ কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

মংলার কোস্টগার্ড ও স্থানীয়দের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে জলদস্যুদের দমনে কোস্টগার্ড স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর অনুযায়ী কাজ করছে। চিহ্নিত ডাকাত মিরাজের অনুসারীরা কোস্টগার্ডের ওপর হামলা চালালে কোস্টগার্ড আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নেয় এবং বর্তমানে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

আগামী ২৩শে জুন একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক (সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী পুলিশের অ্যালার্ট জারির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, "উক্ত দিনটিকে কেন্দ্র করে তারা দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাতে পারে বলে আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ সর্বদা তৎপর এবং যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক অপচেষ্টা নস্যাৎ করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।"

পুরস্কারের আওতায় আসা ঘটনা চারটি হলো যথাক্রমে জনভোগান্তি লাঘবে ট্রাফিক পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ; আদাবরে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার ও সাহসিকতা; আনোয়ারায় চাঞ্চল্যকর মা-মেয়ে হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেফতার এবং চকরিয়ায় আলোচিত ডাকাতি ও গণধর্ষণ মামলার আসামিদের আইনের আওতায় আনয়ন।

জনভোগান্তি লাঘবে ট্রাফিক পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ: গত ১০ জুন ২০২৬ তারিখে ভারী বর্ষণের কারণে কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের লুপ-টু নামার প্রান্তে সড়কের পানি নিষ্কাশন ড্রেনের মুখে ব্যাপক ময়লা-আবর্জনা জমে পানি জমাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ডিউটিরত ট্রাফিক কনস্টেবল মো. কামরুজ্জামান তাৎক্ষণিকভাবে নিজ হাতে ড্রেনের ময়লা পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেন, যার ফলে দ্রুত যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার মতো এই প্রশংসনীয় কাজের জন্য ট্রাফিক গুলশান বিভাগের বাড্ডা জোনের কনস্টেবল মো. কামরুজ্জামানকে 'পুলিশ ফোর্স এক্সেমপ্লারি গুড সার্ভিস ব্যাজ', অর্থ পুরস্কার ও প্রশংসাপত্র প্রদান করা হয়।

আদাবরে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার ও সাহসিকতা: গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে আদাবর থানার মফিজবাগ এলাকায় একটি বিকাশের দোকানে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় অভিযানকালে ছিনতাইকারীদের অতর্কিত হামলায় আদাবর থানার ওসি এবং একজন এসআই গুরুতর আহত হন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশের পাল্টা গুলিতে ২ জন ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধসহ মোট ৪ জনকে আটক করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আভিযানিক দলের সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বিপিএম, পিপিএম (অফিসার ইনচার্জ), এসআই তরুণ কুমার, এএসআই আব্দুল্লাহ সাহক সবুজ, এএসআই সুধন চন্দ্র দে, এএসআই মো. শরিফুল ইসলাম এবং এএসআই মোঃ রবিউল ইসলামকে পুরস্কার প্রদান করা হয়।

আনোয়ারায় চাঞ্চল্যকর মা-মেয়ে হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেফতার: চট্টগ্রামের আনোয়ারার চেনামতি এলাকায় সুজন বড়ুয়ার স্ত্রী ও কন্যাকে নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও আনোয়ারা থানা পুলিশের সমন্বিত টিম তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে পটিয়া থেকে মূল আসামি রিমন বড়ুয়াকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় রাসেল পিপিএম (বার), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি); এসআই শিমুল চন্দ্র দাস (তদন্তকারী কর্মকর্তা); এসআই মোহাম্মদ আবু সেলিম রেজা এবং কনস্টেবল মো. রিমন হোসেন, পিপিএম-কে পুরস্কৃত করা হয়।  

চকরিয়ায় আলোচিত ডাকাতি ও গণধর্ষণ মামলার আসামিদের আইনের আওতায় আনয়ন: কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানা এলাকায় বসতবাড়ির গ্রিল কেটে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুণ্ঠন এবং বাড়ীতে অবস্থানরত মা ও মেয়েকে গণধর্ষণের ঘটনায় মাতামুহুরী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ ভিকটিমদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এবং দ্রুততম সময়ে অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত ৭ জন আসামিকে গ্রেফতার করে, যাদের মধ্যে ২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ ঘটনায় মোঃ মাসুদ (পুলিশ পরিদর্শক, ইনচার্জ, মাতামুহুরী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র), এএসআই সজীব দাস, কনস্টেবল মাহফুজুর রহমান এবং কনস্টেবল হেফাজত হোসেনকে পুরস্কার প্রদান করা হয়।