১৮ জুন ২০২৬, ১৫:০০

সামরিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার গুরুত্ব অপরিসীম: সেনাপ্রধান

সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান   © সংগৃহীত

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘সামরিক জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা অপরিসীম’। তিনি আরও বলেন, মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য একটি দক্ষ, আধুনিক ও দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সেনাবাহিনীর গুরুত্ব অপরিসীম এবং এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব মূলত অফিসারদের ওপরই ন্যস্ত থাকে।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বাংলাদেশ একাডেমির (বিএমএ) ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের কমিশন প্রাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাপ্রধান এই কথাগুলো বলেন। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারির বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত এই চিত্তাকর্ষক কুচকাওয়াজ তিনি পরিদর্শন করেন এবং প্যারেডের অভিবাদন গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি কৃতী ক্যাডেটদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।

সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নিবেদিতপ্রাণ, দক্ষ, চৌকস, মেধাবী এবং একবিংশ শতাব্দীর নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত সেনা অফিসার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই একাডেমি থেকে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের নেতৃত্বে আনুগত্য, শৃঙ্খলা, ন্যায়পরায়ণতা ও কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। 'চির উন্নত মম শির' মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি তাদের দূরদর্শী পরিকল্পনা ও সাবলীল প্রশিক্ষণ পরিচালনার মাধ্যমে আমাদের সেনাবাহিনীকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছে। আমরা বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির এই অবদানের জন্য অত্যন্ত গর্বিত এবং কৃতজ্ঞ।’

বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন, বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আমরা নানা ধরনের বাস্তবমুখী ও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এরই ধারাবাহিকতায় ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ একাডেমিতে আজই আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আমি বিশ্বাস করি, প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার প্রত্যয়ে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ, চৌকস ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

নবীন অফিসারদের উদ্দেশে সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, ‘এই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সদ্য কমিশন প্রাপ্ত অফিসারদের ওপর প্রিয় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব অর্পিত হলো।’

দীর্ঘ তিন বছরের কঠোর ও নিবিড় সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে জমকালো কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৯০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মোট ১৮৪ জন অফিসার ক্যাডেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন লাভ করেছেন। এই নবীন অফিসারদের মধ্যে ১৬৬ জন পুরুষ এবং ১৮ জন নারী অফিসার রয়েছেন। এর পাশাপাশি ৪ জন ফিলিস্তিন, ১ জন তানজানিয়া, ১ জন জাম্বিয়া এবং ১ জন মালদ্বীপের অফিসার ক্যাডেটও এই একাডেমি থেকে সফলভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন, যারা এখন নিজ নিজ দেশের সেনাবাহিনীতে যোগদান করবেন।

এই কোর্সে ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার খায়রুল ইসলাম সেরা চৌকস ক্যাডেট হিসেবে অসামান্য গৌরবমণ্ডিত 'সোর্ড অব অনার' এবং সামরিক বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য 'সেনাবাহিনী প্রধান স্বর্ণপদক' অর্জন করেন। এছাড়া, এই একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ বিদেশি ক্যাডেট হিসেবে 'বিএমএ ট্রফি অব এক্সিলেন্স' অর্জন করেন তানজানিয়ার সার্জেন্ট আবু বকর। কুচকাওয়াজ শেষে প্রশিক্ষণ সমাপনকারী ক্যাডেটরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আনুষ্ঠানিক শপথ নেন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথি এবং নবীন অফিসারদের মা-বাবা ও অভিভাবকরা অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে তাদের র‍্যাঙ্ক-ব্যাজ পরিয়ে দেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধান অতিথি সেনাপ্রধান বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছালে ভারপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড ও কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি এবং ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও এরিয়া কমান্ডার, চট্টগ্রাম এরিয়া তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এই বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করতে অনুষ্ঠানস্থলে সংসদ সদস্যবৃন্দ, দেশি-বিদেশি উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা, সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের অভিভাবক এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।

কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে সেনাবাহিনী প্রধান বিএমএতে নবপ্রতিষ্ঠিত ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের নানা জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএমএ-তে প্রশিক্ষণরত অফিসার ক্যাডেটদের পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতা বাড়াতে '১ম বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' এর পাশাপাশি এই নতুন ব্যাটালিয়নটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সেনাপ্রধান বিএমএতে নবনির্মিত সিএমএইচ, ভাটিয়ারি; বিএমএ পার্ক; বিএমএ সুইমিং এবং এমইএস অফিস কমপ্লেক্স প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন। এই বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।