১৭ জুন ২০২৬, ১৯:৫৯

প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজির নামেও হয়েছে বগুড়ার একটি ইউনিয়নের নাম!

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম  © সংগৃহীত

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনি এলাকা বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ-মোকামতলা উপজেলা) চারটি ইউনিয়ন পরিষদ গঠন ও নামকরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলায় একটি ইউনিয়নের নাম প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি ‘মীরবাড়ি’র নামে ও মোকামতলা উপজেলার নতুন দুটি ইউনিয়নের নাম তার দুই পুত্রের নামে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, আরেকটির নাম ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ করা হয়েছে। এর বাইরে আরেকটি ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।

নতুন ইউনিয়নের নাম প্রতিমন্ত্রীর নিজের বাড়ি ও সন্তানদের নামে করার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। জাতীয় সংসদে চলতি বাজেট অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে সংসদ সদস্যরা এ বিষয়ে নিজেদের আপত্তি উত্থাপন করে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তব্য দেন। 

সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলামের একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। সেখানে ইউনিয়নের নামকরণের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন প্রতিমন্ত্রী। বিষয়টিকে তিনি কাকতালীয় বলে উল্লেখ করেন। 

এর আগে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এলাকায় একটি ইউনিয়নে তাঁর মীর বংশের নামে ‘মীরবাড়ি’ নামে নামকরণ করেছেন। তার দুই সন্তান দিগন্ত ও সীমান্তের নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী নাকচ করেছেন। আমরা বাহবা দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যা চান, সেটাই তো মন্ত্রীদের চাওয়ার কথা। বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে নাম সংশোধনী করতে অনেক সময় কেটে গিয়েছিল। এখন একই সংস্কৃতি আমাদের মাঝে ফিরছে।’

তবে ওই আলোচনায় আসেনি যে প্রতিমন্ত্রীর এক ভাতিজির নাম ‘স্বর্ণালী’, আর নতুন চারটি ইউনিয়নের আরেকটির নাম। জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর এক ভাতিজির নাম ‘স্বর্ণালী’, আবার নতুন আরেকটি ইউনিয়নের নাম ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।

বগুড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, যে নামকরণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, উপজেলা প্রশাসনের সুপারিশ, স্থানীয় মতামত এবং গণশুনানির ভিত্তিতে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রতিমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে তাকে কোনো নির্দেশনা দেননি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বক্তব্য এসেছে। বলা হয়েছে, তিন সদস্যের একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

তবে প্রশাসনিক ব্যাখ্যার পরও বিতর্ক থামেনি। কারণ জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে, যদি নামগুলো সত্যিই কাকতালীয় হয়, তাহলে সেই কাকতালীয় ঘটনাও কেন এত আলোচনার জন্ম দিল? 

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের এক সংসদ সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন এ নিয়ে– যখন আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যায় না, তখন কীভাবে এমন নাম অনুমোদন পেল? তিনি এটিকে অতীতের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য ছিল, জনগণ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে, যেখানে ব্যক্তিপূজা বা পারিবারিক প্রভাবের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ গুরুত্ব পাবে।

জবাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে বলেন, ইউনিয়নগুলোর নাম তার সন্তানদের নামে রাখা হয়নি। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক যাচাইয়ের ভিত্তিতেই নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সীমান্ত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে তিনি যুক্তি দেন যে, এলাকাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় এমন নামকরণ হয়েছে। একইভাবে দিগন্ত নামটিও ভৌগোলিক বাস্তবতার আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন। এমনকি তিনি রসিকতার সুরে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমান্ত ও দিগন্ত নামের বহু প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা এবং পরিবহন রয়েছে। সেগুলোও কি তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত?

এবার ভাতিজির নামে নামকরণ করা ইউনিয়ন ‘স্বর্ণগ্রাম’ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী কী ব্যাখ্যা দেন, সেটাই দেখার বিষয়।