নারীদের জন্য নিরাপদ অনলাইন স্পেস তৈরি করা জরুরি: সংসদে মানসুরা
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনীত ৩৬ জনের মধ্যে মানসুরা আক্তার সর্বকনিষ্ঠ। প্রথমবারের মতো আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের অষ্টম দিন তিনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে নারীদের অধিকার নিয়ে নানা বিষয় তুলে ধরেন। তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ৮ মিনিটের দেওয়া বক্তব্যে এই সংসদ সদস্য বলেন, নারীদের জন্য নিরাপদ অনলাইন স্পেস তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। অনলাইনে প্রতিনিয়ত নারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, কিন্তু সেই তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও কার্যকারিতায় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তাই অনলাইন অপরাধ দমন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বাজেটে আরও জোরালোভাবে থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।
মানসুরা আক্তার বলেন, আমাদের সমাজে নারীরা শুধু পরিবারের সদস্য নন। তাঁরা পরিবারের অর্থনীতির ব্যবস্থাপক, সন্তানের প্রথম শিক্ষক, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের নীরব শ্রমশক্তি, এবং জাতির অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই নারীকে ক্ষমতায়ন করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সহায়তা করা নয়, বরং একটি পরিবারকে শক্তিশালী করা, একটি প্রজন্মকে নিরাপদ করা, এবং একটি জাতিকে এগিয়ে নেওয়া।
‘‘এই বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আমি বিশেষভাবে স্বাগত জানাই। কারণ এই কার্ড সরাসরি মা অথবা পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারী শুধু ভাতা গ্রহণকারী নন, বরং পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্তে তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে। প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি মোবাইল বা ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়া শুধু নগদ সহায়তা নয়, এটি নারীর হাতে বাস্তব অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে এই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার প্রস্তাব নিঃসন্দেহে নারী ক্ষমতায়নের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।’’
তিনি বলেন, আমি আনন্দের সঙ্গে আরও উল্লেখ করতে চাই যে বিধবা ও নিগৃহীতা নারীদের ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আমাদের সমাজে অনেক নারী আছেন, যাঁরা স্বামী হারিয়েছেন, পরিবার হারিয়েছেন বা সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব। এই বাজেট সেই দায়িত্ব পালনের একটি অঙ্গীকার।
‘‘মাতৃত্ব শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় দায়িত্বও। একজন সুস্থ মা মানে একটি সুস্থ শিশু, আর একটি সুস্থ শিশু মানে একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। এ কারণে জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। গর্ভবতী মা, নবজাতক এবং শিশুদের যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং জীবনের প্রথম কয়েক বছর নিরাপদ রাখা গেলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ব্যয় কমবে, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ উন্নত হবে এবং পরিবারে স্থিতিশীলতা বাড়বে।’’
তিনি আরও বলেন, নারীর নিরাপত্তা ছাড়া নারী উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পায় না। একজন মেয়ে যদি নিরাপদে স্কুলে যেতে না পারে, একজন নারী যদি নিরাপদে কর্মস্থলে যেতে না পারে, একজন মা যদি নির্যাতনের বিচার না পান, তাহলে উন্নয়নের সব কথা বাস্তবে অর্থহীন হয়ে যায়। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি ও বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাব প্রতিষ্ঠা, এবং কুইক রেসপন্স টিম গঠন, এসব উদ্যোগকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।
‘‘তবে শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না। প্রতিটি জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, ভিকটিম সাপোর্ট, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে। আমি অনুরোধ করবো, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত সেবার জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হোক, যাতে ভুক্তভোগী নারী সহজে জানতে পারেন তাঁর মামলার অবস্থা, কোথা থেকে সহায়তা পাবেন, এবং রাষ্ট্র তাঁর পাশে আছে।’’