ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই, কিন্তু সীমান্ত হত্যা মেনে নেব না — মির্জা ফখরুল
প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ কখনোই ঝগড়া-বিবাদ করে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার (১৬ মে) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফারাক্কা লং মার্চ দিবস উপলক্ষে ভাসানী জনশক্তি পার্টি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সুসম্পর্ক চাই কিন্তু যখন আমার সীমান্তে গুলি করে আমাদের নাগরিকদের হত্যা করা হয়, তখন সেটাও আমরা মেনে নিতে পারি না। আমরা তীব্র ভাষায় তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং সীমান্তে হত্যা বন্ধের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আর কোনো টালবাহানা না করে এই ডিসেম্বর মাসে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করা হোক। পরবর্তী নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য হলেও তা কার্যকর রাখা হোক।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নবনির্বাচিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বলব, দয়া করে বিভাজনের রাজনীতি করবেন না, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য দেবেন না, যাতে বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। যেসব বক্তব্য প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলো সুসম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়। যদি সত্যিই সুসম্পর্ক চান, তাহলে বক্তব্য ও কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করুন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু গঙ্গা নয়, তিস্তা নয়- সব নদীই আমাদের জীবন, আমাদের মানুষের জীবিকা। আজ এই নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা আমরা চাই। আমাদের জনগণ, বিশেষ করে সীমান্ত ও নদী তীরবর্তী মানুষ যেন তাদের অধিকার আদায় করতে পারে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ফারাক্কা লং মার্চ আমাদের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কীভাবে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা যায় তা সফলভাবে করেছিলেন মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।এই প্রজন্মের অনেকেই মাওলানা ভাসানীকে চেনে না। অথচ তিনি ছিলেন এক কিংবদন্তি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান আন্দোলন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই তিনি সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে লড়েছেন।’
ফারাক্কা চুক্তি নবায়নে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এটি নবায়ন হবে কি না। আমরা মনে করি, এই প্রশ্নে পুরো জাতিকে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটি কোনো দলের জন্য নয়, কোনো সরকারের জন্য নয় এটি দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে।’
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িকতা বিশ্বাস করে না। যারা ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতির খেলা খেলতে চায়, তাদের এই দেশের মানুষ কখনোই পছন্দ করবে না।’
সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে শুধু ফারাক্কা লং মার্চের জন্য স্মরণ করছি না; তার দূরদর্শী দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে নতুন করে সম্মান জানানোর সময় এসেছে। অসুস্থ শরীর নিয়েও জীবনের শেষ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন এই দেশের মানুষের কল্যাণই ছিল তার একমাত্র ব্রত।’
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি বুঝেছিলেন, উজানের দেশ যদি ভাটির দেশের সঙ্গে ন্যায্য পানি বণ্টনের চুক্তি না করে, তার ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। পানি বণ্টনের আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকলেও আজ তা বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নির্ভর করছে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর।’
সভাপতির বক্তব্যে ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘আগামী ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে বলব এই চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হোক এবং ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের দেওয়া হোক। যদি প্রয়োজন হয়, আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে যাব, জাতিসংঘে যাব। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য পানির অধিকার আমরা আদায় করবই।’
তিনি বলেন, “আমরা অনেক ধৈর্য ধরে সীমান্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর হামলা হচ্ছে, মসজিদে হামলা হচ্ছে। আমরা ভারত সরকারকে বলব এসব বন্ধ করুন।’
আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন ভাসানী জনশক্তি পার্টির মহাসচিব ড. আবু ইউসুফ সেলিম। সভায় সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।