পদ্মা সেতুর গৌরবগাথা সংরক্ষণে জাজিরা প্রান্তে ‘পদ্মা সেতু জাদুঘর’ স্থাপন
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আগামী ৫ বছরে মোট ২৫কোটি বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পদ্মা সেতু সাইট অফিসে সেতু বিভাগের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন এবং একইসঙ্গে পদ্মা সেতুর নির্মাণ ইতিহাস ও কারিগরি শৌর্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চিরস্মরণীয় করে রাখতে জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।
সোমবার (১১ মে) এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন এবং জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, শরীয়তপুর-১ সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ।
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে নির্মিত দেশের সর্ববৃহৎ সেতু। সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কি.মি. এবং প্রস্থ ১৮.১০ মিটার।
২০০২-২০০৫ অর্থবছরে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। সমীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মাওয়া প্রান্তে সেতুর অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেন। এ প্রেক্ষিতে ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য কার্য্যক্রম হাতে নেয়া হয়। নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ সেতু দেশের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
এ কর্মসূচির আওতায় পদ্মা সেতুর উভয় প্রান্তে আগামী ৫ বছরে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছসহ সর্বমোট ১,০০,০০০ (এক লাখ) বৃক্ষ রোপণ করা হবে। এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পদ্মা সেতু এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং সবুজায়নের পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করা হবে। পদ্মা সেতু এলাকাকে একটি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো অঞ্চলে রূপান্তরের পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং টেকসই সবুজায়ন কার্যক্রমকে আরও বেগবান করবে।
মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, এই জাদুঘরটি নির্মাণের মাধ্যমে আমরা সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙ্গা জবাব এবং প্রকৌশলবিদ্যার এই বিস্ময়কর যাত্রাকে সংরক্ষণ করছি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখান থেকে দেশপ্রেম ও স্বনির্ভরতার প্রেরণা পাবে। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আজ যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু হলো, তা এই সেতুর চারপাশকে একটি পরিবেশবান্ধব সবুজ বলয়ে পরিণত করবে।
বিশেষ অতিথি প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, কারিগরি উৎকর্ষের এক অনন্য নিদর্শন পদ্মা সেতু। এটি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উন্মুক্ত পাঠশালা হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া আমরা উন্নয়নের সাথে পরিবেশের মেলবন্ধন ঘটাতে চাই। সেতু এলাকায় ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ আমাদের সেই টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
সভাপতির বক্তব্যে সেতু সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর শ্লোগান "বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ সবার আগে বাংলাদেশ"। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে আমাদের সাইট অফিসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে সেইসাথে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং অত্যন্ত গর্বের সাথে এই জাদুঘর স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এখানে সেতুর নির্মাণে ব্যবহৃত বিশালাকার যন্ত্রাংশ, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং দুর্লভ সব আলোকচিত্র স্থান পাবে।
পদ্মা সেতু জাদুঘরটি পদ্মা সেতুর শরীয়তপুর জেলার জাজিরা প্রান্তে নির্মাণ করা হবে। জাদুঘরটি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের মূল প্রকল্পে একটি আধুনিক জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনা কিন্তু বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে জাদুঘর নির্মাণ করা হয়নি।এই যাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ০২ (দুই) বছর (০১/০৪/২০২৬ ইং হতে ০১/০৪/২০২৮ ইং পর্যন্ত)। এই জাদুঘরে সেতুর পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তের দলিল, দুর্লভ আলোকচিত্র, ডিজিটাল মডেল এবং নির্মাণে ব্যবহৃত বিশালাকার যন্ত্রপাতির অংশবিশেষ সুসংগতভাবে সংরক্ষণ করা। পদ্মা সেতুর নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট তথ্য, গবেষণা উপকরণ ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক নমুনা ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অনুষ্ঠানে শরীয়তপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সরদার একেএম নাসির উদ্দীন, শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মিজ তাহসিনা বেগম, সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্টমিডিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং সাইট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ উপস্থিত ছিলেন।