সুশাসন নিশ্চিতে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই। প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা না থাকলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট এবং অস্থিরতা তৈরি হয়, যা বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাজধানীর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি অডিটোরিয়ামে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত, শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আলোচনা সভা শুরু হয়।
রিজভী আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে ঐক্য ধরে রাখতে পারলে কোনো শক্তিই বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। ১৭৫৭ সাল থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে বারবার দমনের চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু প্রতিবারই মানুষ সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।’
রিজভী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে দীর্ঘ বঞ্চনা, প্রতিরোধ এবং রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। একটি জাতি কীভাবে দীর্ঘ বিদেশি শাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, ভিয়েতনাম তার অনন্য দৃষ্টান্ত।’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গে রিজভী বলেন,‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নানা সময়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। কখনো এটিকে শুধু ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়, অথচ প্রকৃত সত্য হলো-এটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের যুদ্ধ। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআরসহ সর্বস্তরের মানুষ এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাঁদের ভেতর থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা উঠে এসেছিলেন।’
ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘স্বাধীনতার সব অবদান একটি পরিবার বা একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে উপস্থাপন করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা জাতির আত্মাকে কলুষিত করেছে। স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তাদের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তবে তরুণেরা এখন সত্য বুঝতে পারছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। তার ভাষায়, তারুণ্যের ধর্মই হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।’
স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিজভী আরো বলেন, ‘শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেলেই একটি জাতি পূর্ণ স্বাধীন হয় না। নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, ভোটাধিকার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। গণতন্ত্রের মূল চেতনা হচ্ছে মানুষের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। যদি একটি দল বা একজন নেতার কণ্ঠস্বরই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটি গণতন্ত্র নয়।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘ওই ডিসি আমাদের লোক কি না, ওই বিভাগীয় কমিশনার কোন রাজনৈতিক দলের-এভাবে বিচার করতে গেলে বিভাজন চরমে পৌঁছাবে, আর শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র-দুটোরই অধঃপতন হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে মেধা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সুশাসন না থাকলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, জনগণের অর্থ লুটপাট হয়, তা বিদেশে পাচার হয় এবং তখন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ‘ফেইলড স্টেট’ বলার সুযোগও তৈরি হয়।’
জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রিজভী আহমেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।’
অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ও সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য (কিশোরগঞ্জ-৪) বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনএসইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বেনজীর আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনএসইউ’র উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এনএসইউ’র উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেছার ইউ. আহমেদ, এনএসইউ’র কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রব খান, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।
স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক নেছার ইউ. আহমেদ বলেন, এই দিনে আমি স্মরণ করছি আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের আত্মত্যাগে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তাদের ত্যাগের কারণেই আজ আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি, নিজেদের পরিচয়ে বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি।
মুখ্য আলোচক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান বলেন, ‘অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এই ইতিহাস শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়, এটি নতুন প্রজন্মের নৈতিক দায়িত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের অংশ। একই সঙ্গে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে আমাদের বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।’
বিশেষ অতিথি বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সবসময় জাতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ধারণ ও চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্বাধীনতার আদর্শ ও চেতনাকে সমুন্নত রাখতে আমাদের শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি সকল কিছুকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’
উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘যাদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীন দেশ পেয়েছি, তাদের অবদানকে আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই। যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য এক হয়েছিলেন, তাদের ইতিহাস জানা এবং সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা আমাদের দায়িত্ব।’
অনুষ্ঠানের শেষভাগে অতিথিদের সম্মাননা স্মারক প্রদান ও ফটোসেশনের পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সাংস্কৃতিক সংগঠন (এনএসইউএসএস) ও এনএসইউ সিনে অ্যান্ড ড্রামা ক্লাব আয়োজিত একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।