পথেই কাটে ঈদ, নাগরিক নিরাপত্তায় রাজপথেই পুলিশের আনন্দ
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। দেশবাসী যখন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতে ব্যস্ত তখন পরিবার-পরিজন থেকে দূরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় ব্যস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ঈদের দিনটি পরিবারের সঙ্গে কাটানো তো দূরে, একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায়ের সুযোগটুকুও মেলেনি তাদের। ঈদকেন্দ্রিক ঢাকার মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা দিনরাত কাজ করছেন। তাদের দায়িত্বের কাছেই যেন হার মানে ঈদের খুশি। তাইতো আপনজনদের ছেড়ে নগরীর পথে পথে কাটছে পুলিশ সদস্যদের ঈদ।
ঈদ উপলক্ষে দেশবাসী যখন টানা ছুটিতে তখন রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ঈদগাহ ময়দানসহ বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিজেদের ঈদ আনন্দটাও যেন মলিন তাদের।
দেশবাসী যখন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতে ব্যস্ত তখনো পরিবার ছেড়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যস্ত পুলিশ সদস্যরা। পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের সুযোগ মেলেনি, মেলেনি আপনজনের হাত ধরে ঈদগাহ ময়দানে নামাজে শরীক হওয়ার সুযোগটুকুও। ডিউটির ফাঁকেই ঈদের জামাতে অংশ নিতে হয়েছে। তবে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করতে না পারলেও ঈদের দিন উন্নতমানের খাবারের আয়োজন ছিল মানুষের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের জন্য।
দেশের বাস্তবতায় পুলিশের ওপর যে পরিমাণ দায়িত্ব ও চাপ রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ বা সরকার কেউই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেন না। পুলিশ সদস্যরা নিজেদের দায়িত্বকে অনেক সময় ইবাদতের মতো মনে করে কাজ করেন। এত কম জনবল নিয়ে কাজ করার কারণে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত ছুটি পান না।—জুয়েল রানা, এডিসি, তেজগাঁও বিভাগ
বুধবার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার সভাপতিত্বে সমন্বয় সভা তিনি বলেন, ‘পবিত্র ঈদুল ফিতর উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের নেয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়েও নিরাপত্তা সচেতনতাবোধ তৈরি হতে হবে।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ঈদ উদযাপনকে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে প্রতিটি সরকারি সংস্থাকে আগের চেয়ে আরও বেশি মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশনে পর্যাপ্ত সংখ্যক ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশ, ডিবি, সোয়াট, ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করতে পারলে ঈদযাত্রার নানা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।’
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীতে অনুষ্ঠিত সব ঈদ জামাতের নিরাপত্তায় ১৫ হাজার পোশাকধারী পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সর্বদা দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, এবার ঈদের ছুটিতে নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজধানীতে ১৫ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য তৎপর ছিলেন। ঢাকার ৫০ থানা এলাকায় ৭১টি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা হয়েছে। পুলিশের ৬৬৭টি টিম সার্বক্ষণিক টহলে আছে। এছাড়া র্যাব, ডিবি, সিটিটিসি, এপিবিএন, আনসারসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে। দায়িত্ব পালন করেছে অক্সিলারি পুলিশও।
ঈদের দিন রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ঈদগাহ ময়দানসহ বিভিন্ন স্থানে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মুসল্লিদের ভিড়ে তাকালেই দেখা মেলে ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ সদস্যদের। রাজধানীবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঈদ আনন্দটাও মলিন হয়েছে তাদের।
সারা দেশে এ রকম গল্প প্রায় এক থেকে দেড় পুলিশ সদস্য যারা অন্যের ঈদ নির্বিঘ্ন করতে কাজ করে যায়। কেউ ঈদগাহে, কেউ সড়কে, কেউ পশুর হাটে, কেউ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, কেউ অপরাধী ধরতে কেউ বা অপরাধ ঠেকাতে দায়িত্ব পালন করছেন।
কীভাবে বিশেষ এই দিনটি উদযাপন করেন পুলিশ সদস্যরা- জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ডিউটির মধ্যদিয়ে আমাদের ঈদ শুরু হয়। রাস্তায় যে যেখানে ডিউটিতে থাকে সেখানেই সুযোগ বুঝে ঈদের জামাতে অংশ নেয়। নামাজ শেষ করেই আবার ডিউটি শুরু করে।
তিনি বলেন, দেশের বাস্তবতায় পুলিশের ওপর যে পরিমাণ দায়িত্ব ও চাপ রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ বা সরকার কেউই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেন না। পুলিশ সদস্যরা নিজেদের দায়িত্বকে অনেক সময় ইবাদতের মতো মনে করে কাজ করেন। এত কম জনবল নিয়ে কাজ করার কারণে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত ছুটি পান না।
‘অথচ অন্য সব পেশার মানুষ ছুটি পেলেও পুলিশকে প্রায়ই দায়িত্ব পালন করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ পুলিশকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু তিনি বলেন, একজন পুলিশ সদস্য চাকরি ছেড়ে দিলে তার জায়গায় আরেকজন এসে একইভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। সেই ব্যক্তিরও পরিবার, স্ত্রী–সন্তান এবং ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে।’
তিনি বলেন, প্রায়ই বলা হয় পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। কিন্তু এ কথা বলা হলে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করেন। অথচ বাস্তবতা হলো, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পুলিশের সংখ্যা অত্যন্ত কম। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটি এবং সেখানে পুলিশের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। সেই হিসেবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য পুলিশের সংখ্যা হওয়া উচিত প্রায় সাড়ে চার লাখ। কিন্তু বাস্তবে দেশে পুলিশ সদস্য আছেন মাত্র প্রায় দুই লাখ।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ২২ থেকে ২৪ কোটি, সেখানে পুলিশের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি হলেও পুলিশের সংখ্যা মাত্র দুই লাখ। একইভাবে রাজধানী শহরগুলোর তুলনা টানতে গিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ বাস করে, অথচ পুলিশ সদস্য আছেন মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ হাজার। অন্যদিকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য পুলিশ সদস্য আছেন প্রায় এক লাখ।
তিনি আরও বলেন, কলকাতার মতো তুলনামূলক শান্ত ও ছোট শহরেও প্রায় এক কোটি থেকে সোয়া কোটি মানুষের জন্য প্রায় ৪০ হাজার পুলিশ সদস্য রয়েছে। অথচ ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী শহর, যেখানে সারাদিন নানা ধরনের অপরাধ, মারামারি, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাত, ঘেরাও–অবরোধের মতো ঘটনা ঘটে, সেখানে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ হাজার পুলিশ দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
এডিসি জুয়েল জুবায়ের বলেন, এত কম জনবল নিয়ে পুলিশের পক্ষে নিয়মিত ছুটি দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের পরিবার—স্ত্রী ও সন্তানদেরও কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু এসব কথা বলার মতো জায়গাও খুব কম। পুলিশ যখন নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে যায়, তখন অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা বা গালিগালাজের মুখে পড়তে হয়।
তার মতে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেকোনো মানদণ্ডে দেশে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ লাখ পুলিশ সদস্য থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে মাত্র দুই লাখ পুলিশ দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা বা আফ্রিকার অনেক দেশের সঙ্গেও তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের জন্য অন্তত চার লাখ পুলিশ সদস্য প্রয়োজন।
এদিকে এই বছর ‘কর্তব্যের তরে করে গেল যারা, আত্মবলিদান প্রতিক্ষণে স্মরি, রাখিব ধরি তোমাদের সম্মান’ এই প্রতিশ্রুতি বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ পুলিশের সম্মানিত ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) জনাব মো. আলী হোসেন ফকির মহোদয়ের পক্ষ থেকে পবিত্র ঈদুল ফিতর-২০২৬ উপলক্ষে কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী দেশপ্রেমিক পুলিশ সদস্যদের পরিবারবর্গকে ঈদ শুভেচ্ছা বার্তাসহ খাদ্য উপকরণ ও উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।