শুরু হচ্ছে বিএনপির প্রতিশ্রুত ও আকাঙ্খিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ
নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় সুযোগ পেলে নারী সমাজের ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিতে দেশের প্রতিটি পরিবারের গৃহিনী নারীদের মধ্যে (পরিবার প্রধান) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ লন্ডনে নির্বাসিত থাকাবস্থায়ই তিনি দলের এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের কাছে দেয়া নির্বাচনী ইশতেহারেও দলটি এই প্রতিশ্রুতি দেয়। বিএনপি প্রধানের এই ঘোষণার মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী সমাজের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও সাড়া পড়ে।
এরপর গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয় দলটি। অবশেষে ক্ষমতাগ্রহণের মাত্র ২০দিনের মধ্যে পাইলটিং কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৩ সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামীকাল রাজধানীর বনানী এলাকার টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ডের শুভ উদ্বোধন করবেন।
বিএনপি দাবি করছে, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভোধনের মধ্যদিয়ে জাতীয় নির্বাচনে জনগণের কাছে দেয়া দলের প্রতিটি অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ। একে একে জনগণের কাছে দেয়া প্রতিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপি অবশ্যই অঙ্গীকার রক্ষা করবে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় অর্জনের বিষয়টি বিএনপি সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এরই অংশ হিসেবে পরিবারের নারী প্রধানের নামে 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রদানের যুগান্তকারী কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জানা গেছে, পাইলটিং কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৩ সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার। প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রতিটি খানার তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও তালিকা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। ওয়ার্ড কমিটি সরেজমিনে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, পরিবারে ব্যবহৃত আসবাব ও গৃহস্থালী সামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি), রেমিট্যান্স প্রবাহ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং সংগৃহীত তথ্য ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা তালিকা উপজেলা কমিটি অধিকতর যাচাই-বাছাই করে উপকারভোগীর তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাইলটিং পর্যায়ে সারাদেশে মোট ৬৭৮৫৪ টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচীর আওতায় যোগ্য উপকারভোগীগণ পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক ২৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হবেন এবং পরবর্তীতে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে
জানা যায়, পাইলটিং পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র সূচক মান নির্ণয়ের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্ত শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ৫১৮০৫ টি খানার (Household) তথ্য যাচাইয়ে ৪৭৭৭৭ টি খানার তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্য হতে ডাবল ডিপিং (একই ব্যাক্তির একাধিক ভাতা গ্রহণ), সরকারি চাকুরি, পেনশন ইত্যাদি কারণে চূড়ান্তভাবে ৩৭৫৬৭ টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদানের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। সমগ্র প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র সূচক মানের ভিত্তিতে সম্পন্ন করায় উপকারভোগী নির্বাচনে কোনরূপ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের অবকাশ নেই বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি।
জানা যায়, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি নারী প্রধান পরিবার একটি করে আধুনিক ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। স্পর্শবিহীন (Contactless) চিপ সম্বলিত এই কার্ডে QR Code (বার কোডের তথ্যসহ) ও NFC (Near Field Communication) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে কার্ডটি নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে। কোন একটি পরিবারের ০৫ জন সদস্যের জন্য ০১টি ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। তবে যৌথ/একান্নবর্তী পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা ০৫ এর অধিক হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড প্রদান করার বিষয়টি বিবেচনা করবে সরকার। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহ প্রধান যদি অন্য কোন সরকারি ভাতা/সহায়তা পান সেক্ষেত্রে সেই সকল বিদ্যমান সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে, তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অন্যান্য ভাতা গ্রহণ অব্যহত থাকবে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচীর আওতায় যোগ্য উপকারভোগীগণ পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক ২৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হবেন এবং পরবর্তীতে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, পাইলটিং পর্যায়ে কোন পরিবারের কোন সদস্য সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান হতে বেতন/ভাতা/অনুদান/পেনশন পেয়ে থাকলে, নারী পরিবার প্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারী হিসেবে চাকুরিরত থাকলে উক্ত পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না। এছাড়াও পাইলটিং পর্যায়ে কোন পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে বা বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন: গাড়ি, এসি) থাকলে বা ০৫ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে উক্ত পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
পাইলটিং পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জুন মাস পর্যন্ত ৩৮.০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ হতে ফ্যামিলি কার্ড ভাতা জি-টু-পি (Government to Person) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর পছন্দ অনুযায়ী তার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক একাউন্টে জমা হবে। তথ্য সংগ্রহকালীন সময়েই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক একাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে করে কোন প্রকার বিলম্ব, ভুল একাউন্টে জমা বা কোন প্রকার হস্তক্ষেপ ব্যতীত উপকারভোগীগণ ঘরে বসেই সরাসরি সরকার হতে ভাতা প্রাপ্ত হবেন।
সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, পাইলটিং পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জুন মাস পর্যন্ত ৩৮.০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যার মধ্যে ২৫.১৫ কোটি টাকা (৬৬.০৬%) সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান এবং ১২.৯২ কোটি টাকা (৩৩.৯৪%) কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম প্রণয়ন, কার্ড প্রস্তুতি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে।