ঈদের আগেই পে-স্কেল চেয়ে একযোগে ১৪ মন্ত্রী ও ৬ প্রতিমন্ত্রীকে স্মারকলিপি
সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে ঈদের আগে পে-স্কেলের গেজেট জারির দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ একযোগে ১৪ মন্ত্রী ও ৬ প্রতিমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ।
বুধবার (৪ মার্চ) তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যলয় বরাবর এসব স্মারকলিপি দেন সংগঠনটির নেতারা। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই স্মারকলিপি দেন সংগঠনটির নেতারা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, 'বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারি দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ' দেশের কর্মচারি অঙ্গনে সর্ববৃহৎ পেশাজীবী সংগঠন। উক্ত সংগঠন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সকল দপ্তর/প্রতিষ্ঠান ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দপ্তর ভিত্তিক সংগঠন ও জাতীয় ভিত্তিক সংগঠনসমূহের সমন্বয়ে গঠিত জোট। বর্ণিত সংগঠনের ব্যানারে ২০১৫ সালে দেয় ৮ম পে-স্কেলে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারিদের বৈষম্যের বেড়াজালে আবদ্ধ করার পর থেকেই প্রথম পর্যায়ে পে-স্কেলের বৈষম্য নিরসনের জন্য আবেদন নিবেদনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেও তৎকালীন সরকারের নিকট থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি বিগত কোনো সরকার উক্ত সংগঠনের সঙ্গে আলোচনাও করেননি। অথচ বিগত বিএনপি'র সরকার ১৯৯১ ও ২০০৫ সালে কর্মচারীদের দুঃখ দুর্দশার বিষয় বিবেচনা করে দুটি পে-স্কেল দিয়েছিলেন। বিগত ১১ বছর কর্মচারিরা পে-স্কেল থেকে বঞ্চিত। দ্রব্য-মূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতির দরুণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ৬ সদস্য পরিবারের ব্যয়ভার বহন করা নিয়ে কর্মচারিরা দিশেহারা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ঈশতেহার ও আপনার বিবৃতি ছিল 'যথা সময়ে ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে'। যার ফলশ্রুতিতে কর্মচারিরা আশান্বিত হয়েছে।’
এতে আরও বলা হয়েছে, ‘উক্ত সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০১৯ সাল থেকে বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আবেদন নিবেদনসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। এর ধারাবহিকতায় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছেও আবেদন নিবেদনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখি, তৎপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সনে ৯ম পে-কমিশন গঠিত হয়েছে, যার রিপোর্ট ইতোমধ্যে সরকারের কাছে প্রদান করেছেন। কিন্তু অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার পে-স্কেল প্রদানের আশ্বাস দিয়েও তা বাস্তবায়ন করেননি। পূর্বের অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারিদের বেতন বৈষম্য ও পদ বৈষম্য দূর না করে শুধুমাত্র প্রশাসন ক্যাডারে কর্মরত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি অবসরে যাওয়ার পরেও কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এতে করে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটির দ্বারা ১১-২০ গ্রেডে কর্মরত কর্মচারিগণ বিন্দুমাত্র লাভবান হয়নি।’
স্মারকলিপিতে সংগঠনটির নেতারা বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে নাগরিকদের যুক্তি সংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসাবে বলা হয়েছে। একজন কর্মচারির পরিবারে ৬ জন সদস্য বিবেচনায় সর্বনিম্ন বেতন ৮২৫০ টাকায় ৩ বেলা খাবার, মাথা গোঁজার ঠাই, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, অতিথি আপ্যায়ন ও বিনোদন ব্যয় মিটিয়ে মানবিক ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে জীবন ধারন করা সম্ভব নয়। এছাড়া ২০ থেকে ১১ গ্রেডের কর্মচারিদের বেতন ৮২৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় শেষ হয়েছে। এই ১০ গ্রেডের বেতন স্কেলের মোট পার্থক্য ৪২৫০ টাকা। একই সময়ে ১০ থেকে ১ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৭৮ হাজার টাকায় শেষ হয়েছে।’
তারা বলেন, ‘১- ১০ গ্রেডের বেতন স্কেলের মোট পার্থক্য ৬২০০০ টাকা। এছাড়াও কর্মকর্তাদের রয়েছে গাড়ি, আবাসিক সুবিধা, সুদমুক্ত গাড়ীর ক্রয় ঋণ, কুক-মশালচি, দারোয়ানসহ নানাবিধ সুবিধা এমনকি সচিব ও সিনিয়র সচিবদের কুক ও গার্ড পদে লোক নিয়োগ না দিয়ে, সেবা না নিয়ে প্রতি মাসের বেতনের সাথে ১৬০০০+১৬০০০ = ৩২০০০ টাকা করে প্রদান করাসহ একাধিক সুবিধা প্রদান করা হলেও আমাদের ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারিদের বেতন-ভাতাদি খাতে কোন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়নি। ১ম-২০তম গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:১০। অথচ আমরা প্রত্যেকেই একই বাজার ব্যবস্থার আওতায় জীবন ধারণ করি, এতে প্রতিদিন শ্রেণী বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। ২০১৫ সালে ৮ম পে-স্কেলের গেজেট জারীর পর থেকে প্রায় ১১ বছর পূর্ণ হয়েছে। অথচ এ সময়ের মধ্য ২'টি পে-স্কেল পাওয়ার কথা ছিল।’
তারা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিক চাকুরির ক্ষেত্রে পদবী অনুযায়ী সকল সুযোগ সুবিধা সমানভাবে ভোগ করার কথা থাকলেও সচিবালয়ের বাহিরের দপ্তর, অধিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারিরা নানাও সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শুধুমাত্র সচিবালয়ের কর্মরত কর্মচারিদের পদনাম ১৯৯৫ সালে পরিবর্তনসহ গ্রেড পরিবর্তন করে তাদের দাপ্তরিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, হাইকোর্ট এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে কর্মরত কর্মচারিদের পদবী ও গ্রেড পরিবর্তন করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত কর্মচারিদের পদবী পরিবর্তন করে তাদেরও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
স্মারকলিপিতে সংগঠনটির নেতারা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও স্বাধীন দেশের গণকর্মচারি হিসেবে সচিবালয়ের ন্যায় সচিবালয়ের বাহিরের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, দপ্তর, পরিদপ্তর ও অধিদপ্তরের কর্মচারিদের পদনাম বা গ্রেডের কোন পরিবর্তন করা হয়নি। উল্লেখিত বিষয় বিবেচনায় সচিবালয়ের ন্যায় সকল দপ্তর, অধিদপ্তরের কর্মচারিদের পদ-পদবী পরিবর্তনসহ এক ও অভিন্ন নিয়োগবিধি গণকর্মচারিদের সমঅধিকার রক্ষার স্বার্থে প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’
নেতারা আরও বলেন, ‘বর্তমান বাজারে দ্রব্য-মূল্যের উর্দ্ধগতির কারণে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারিদের রাষ্ট্র ঘোষিত ৬ সদস্য বিশিষ্ট পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্দশার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন সে বিষয়ে আপনি অবগত রয়েছেন। প্রতি মাসের প্রাপ্ত বেতন ভাতা দিয়ে কোন কর্মচারিই পরিবার নিয়ে চলতে পারে না। বিধায় বিদ্যমান ভাতাসমূহ যেমন মেডিকেল ভাতা ১৫০০/- স্থলে ৫০০০/-, যাতায়াত ভাতা ৩০০/- স্থলে ৩০০০/-, টিফিন ভাতা ২০০/- স্থলে ৩০০০/-, শিক্ষা সহায়ক ভাতা সন্তান প্রতি ৫০০ স্থলে ৩০০০ করার দাবী জানাচ্ছি। এছাড়া ঝুকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কর্মচারিদের জন্য মূল বেতনের ৩০% ঝুঁকিভাতার দাবি জানাচ্ছি। বর্তমানে প্রদত্ত বাড়ি ভাড়া ভাতা ৪০% এর পরিবর্তে ৮০% করার দাবি জানাচ্ছি। এছাড়া বৈশাখী ভাতা ২০% এর পরিবর্তে ১০০% প্রদানসহ আগামী বিজয় দিবস থেকে বিজয় দিবস ভাতা চালুর দাবী জানাচ্ছি। সেই সাথে চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর ও অবসরের বয়স সীমা ৬২ বছর নির্ধারণ করা জরুরি।’
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ‘অতএব, মহোদয় সমীপে বিনীত আরজ দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির কারণে পরিবারের ভরণ পোষণের ব্যয় বৃদ্ধি ও কর্মচারিদের ন্যায্য অধিকার বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল ১:৪ অনুপাত ১২টি গ্রেডের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন ৩৫,০০০/- বেতন নির্ধারণ পূর্বক আপনার মহানুভবতায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বে অর্থাৎ আগামী ১৫ মার্চ ২০২৬ এর মধ্যে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের জন্য সবিনয়ে অনুরোধ জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ আপনার সহায় হউন।’