২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:০৮

চালু হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, অর্থ আসবে কোথা থেকে, কারা পাবেন

ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ক সভায় সভাপতিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  © সংগৃহীত

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার আগামী ১০ মার্চ থেকেই দেশে পরীক্ষামুলক ভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যা এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলটির অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার প্রাথমিকভাবে যেসব ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে তার বিপরীতে কার্ডধারী আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি উপজেলায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন বলে সরকারের দিক থেকে জানানো হয়েছে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, এখন আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে থোক বরাদ্দ নেওয়া হবে। তবে আগামী বাজেট থেকে এ খাতে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ থাকবে বলে জানিয়েছেন।ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় ইশতেহারে বিএনপি নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছিলেন তার শুরুতেই ছিল এই ফ্যামিলি কার্ড।

এতে বলা হয়েছিল 'প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে 'ফ্যামিলি কার্ড' চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে'।

প্রসঙ্গত, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টিসিবির মাধ্যমে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছিল যার মাধ্যমে কার্ড গ্রহীতা বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে টিসিবি থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্য কিনতে পারতেন।

কারা পাবেন, কিভাবে বাছাই হবেন তারা

সমাজকল্যানমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, সচিবালয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে হওয়া এক বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কর্মসূচি শুরুর প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ওই বৈঠকেই বলা হয়েছে, এখন একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় ১৪টি উপজেলা থেকে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডকে বাছাই করা হচ্ছে এবং সেই ওয়ার্ডের প্রতি পরিবারের একজন নারী এই কার্ড পাবেন।

"এই কার্ডের সুবিধা পাবেন পরিবারের মা বা নারী প্রধান। এর মাধ্যমে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে এবং পুরো পরিবার ও আগামী প্রজন্ম এর সুফল পাবে। আগামী চার মাসে পাইলটিং কাজ শেষ হবে। এরপর প্রতিটি উপজেলায় এর আওতায় আসবে," বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে বলেছেন মি. হোসেন।

সরকারের এখনকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি ওয়ার্ডে যে কতজন এই কার্ড পাওয়ার উপযুক্ত হবেন তাদের সবাইকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এজন্য মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়েরা এই সুবিধা পাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে যাচাই বাছাই করে এ তিন ধরনের পরিবার থেকে কার্ড গ্রহীতাদের নাম নিশ্চিত করা হবে।

মন্ত্রী বলেছেন, "এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার কাজ হবে। বিএনপির অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে এটা নিয়ে কাজ করেছেন। ওনার সভাপতিত্বেই আজ এটি অনুমোদিত হয়েছে"।

কত দেওয়া হবে, টাকার সংস্থান কিভাবে হবে

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যারা ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবে তারা কার্ড পাওয়ার পর প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। অনুদানের এই অর্থ সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয় এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ থোক বরাদ্দ হিসেবে দিবে। পরবর্তীতে আগামী জুনে জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় সেখানে এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সরকার দেবে বলে সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, একটি ফ্যামিলি কার্ডে প্রতি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে। এছাড়া একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা পাবেন না, তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রাপ্য সুবিধা পাবেন।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও'র নেতৃত্বে এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

"তদারকির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া ভুলত্রুটি এড়াতে 'দ্বিস্তর বিশিষ্ট' চেকিং ও রি-চেকিং ব্যবস্থা থাকবে," ব্রিফিংয়ে বলেছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

ফ্যামিলি কার্ড প্রথম দফায় যাদের দেওয়া হবে তাদের কীভাবে বাছাই করা হচ্ছে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, "বাছাই করা হচ্ছে না। ইনফরমেশন কালেক্ট করা হচ্ছে প্রতিটি ডোর-টু-ডোর স্টেপস অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে। কোনো অবস্থাতেই ঘরে বসে কোনো বাছাই হবে না"।

আবেদন করা যাবে যেভাবে

নির্বাচনের আগে ২২ জানুয়ারি সিলেট এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন যে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশের ৪ কোটি পরিবারকে 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়া হবে।

তিনি তখন বলেছিলেন যে এই ফ্যামিলি কার্ডটি মূলত পরিবারের প্রধান নারীর নামে দেওয়া হবে। সরকার জানিয়েছে এখন মাঠপর্যায়ে নির্ধারিত উপজেলার নির্ধারিত ওয়ার্ডে ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই পাইলট প্রকল্প আগামী চার মাসে শেষ হবে এবং এরপর পর্যায়ক্রমে সারাদেশের প্রতিটি উপজেলাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনতে এবং অনিয়ম রোধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করছে সরকার। তবে আগ্রহীরা কিভাবে আবেদন করবেন তা এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।

পাইলট প্রকল্পে যাদের বাছাই করা হচ্ছে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, রঙ্গিন ছবি ও একটি সচল মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক নম্বর থাকে সেটি নিজেদের কাছে রাখতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পরে একটি নির্দিষ্ট আবেদন ফরম থাকবে যা আগ্রহীরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা সরকারের একটি অনলাইন পোর্টাল থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।

প্রসঙ্গত, নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকে অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

ওই কমিটিকে ঈদের আগেই যাতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করা হয় সেজন্য আজ মঙ্গলবারের মধ্যে‌ একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। আজ সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ১০ মার্চ থেকে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরকারের অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সমন্বয় করা হবে।