১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:১৮

খাগড়াছড়িতে ১২১ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, সর্বাত্মক প্রস্তুতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বাত্মক প্রস্তুতি  © টিডিসি ফটো

পাহাড়, দুর্গমতা আর বহুমাত্রিক বাস্তবতার নাম খাগড়াছড়ি। সেই খাগড়াছড়িতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্নমাত্রার এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা। ২৯৮ নম্বর সংসদীয় আসনে মোট ১১ জন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিপুলসংখ্যক ভোটার এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন যেন পাহাড়ি এই জনপদে এক কঠিন পরীক্ষা।

নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসন নিয়েছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি। নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত রাখতে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা।

কড়া নিরাপত্তা, টহল আর মহড়া:

নির্বাচন ঘিরে সোমবার বিকেলের পর খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শুরু হয় যৌথ টহল ও মহড়া কার্যক্রম। সেনাবাহিনীর সদর রিজিয়ন থেকে বের হওয়া একটি টহল দল জেলার প্রধান সড়কগুলোতে মহড়া দেয়। তাদের সঙ্গে অংশ নেয় বিজিবি ও র‌্যাবের সদস্যরাও। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই টহল কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মাঝে নিরাপত্তার অনুভূতি জোরদার করেছে।

দুর্গম এলাকা ছাড়াও উপজেলা সদর ও জেলা শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাগড়াছড়ি জেলায় মোতায়েন থাকছেন ২ হাজার ৬৩৯ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য, ১ হাজার ২৫০ জন পুলিশ সদস্য, ৩০ প্লাটুন বিজিবি এবং র‌্যাবের একাধিক টহল দল।

ভোটার সংখ্যা ও ভোটের সমীকরণ:

খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার রয়েছেন ৪ জন। পুরুষ ও নারী ভোটারের ব্যবধান খুবই সামান্য,এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দিচ্ছে নারী ভোটারদের গুরুত্ব কতটা বেড়েছে এবারের নির্বাচনে।

এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ও নতুন ভোটার এবারের নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোটের মাঠে তাই প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপেও তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চোখে পড়ছে।

বিস্তৃত আসন, বড় চ্যালেঞ্জ:

ভৌগোলিকভাবে খাগড়াছড়ি ২৯৮ নম্বর সংসদীয় আসনটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। এ আসনে রয়েছে খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গা, পানছড়ি, দীঘিনালা, গুইমারা, লক্ষীছড়ি, মহালছড়ি, রামগড় ও মানিকছড়ি—এই ৯টি উপজেলা। এর সঙ্গে রয়েছে ৩টি পৌরসভা ও ৩৮টি ইউনিয়ন।

এই বিস্তীর্ণ এলাকায় মোট ২০৩টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ১,০২০টি স্থায়ী ভোটকক্ষ এবং ৬৫টি অস্থায়ী ভোটকক্ষ রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১২১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৬৮টি ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত।

হেলিকপ্টারে ভোটের সরঞ্জাম:

অতি দুর্গম এলাকায় নির্বাচন পরিচালনাও বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের নাড়াইছড়ি কেন্দ্র এবং লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ও ফুত্যাছড়ি এলাকার দুটি ভোটকেন্দ্রে হেলিকপ্টারযোগে নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন জানান, এবারের নির্বাচনে খাগড়াছড়ির ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৫৫টিতে সিসিটিভি স্থাপন নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকিগুলোর কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন:
খাগড়াছড়িতে ২০৩টি ভোটকেন্দ্রে প্রত্যেক কেন্দ্রে ১৩জন করে মোট ২৬৩৯জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন থাকবে। এছাড়াও টহল আনসার ব্যালিয়ন টিম নিরাপত্তায় টহলে মাঠে থাকবে।

প্রশাসনের প্রস্তুতি:

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন বলেন, খাগড়াছড়ি ২৯৮ সংসদীয় আসনে মোট ২০৩টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন ২০৩ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ১ হাজার ১০০ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এবং ২ হাজার ২২০ জন পোলিং কর্মকর্তা। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ১৩ জন আনসার সদস্য ও ৩ জন পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র‌্যাবের টহল থাকবে। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ ইনচার্জদের কাছে বডিওর্ন ক্যামেরাও সার্বক্ষণিক চালু থাকবে।

ভোটারদের শঙ্কা ও প্রত্যাশা:

নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কথা বললেও ভোটারদের একটি অংশ এখনো নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে প্রশাসনের আশা,কড়া নিরাপত্তা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির মাধ্যমে খাগড়াছড়িতে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে।