সরকারি গাড়ি রেখে ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশনে বাড়ছে আতঙ্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন বিপুল সংখ্যক যানবাহন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনের আগে ও পরে মিলিয়ে মোট ৪দিনের সরকারি ছুটি রয়েছে। ফলে অফিস না থাকায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ব্যবহৃত গাড়ি ফাঁকা থাকার কথা। তা স্বত্ত্বেও গণপরিবহন ও ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ি রিকুইজিশন (অধিগ্রহণ বা অস্থায়ীভাবে নিয়ে ব্যবহার করা) করছে পুলিশ। এর ফলে ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং তা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগে পুলিশ যেকোনো গাড়ি অনির্দিষ্টকালের জন্য রিকুইজিশন করতে পারত। তবে ২০২২ সালে হাইকোর্টের দেওয়া এক রায়ের পর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার, ট্যাক্সিক্যাব এবং থ্রি-হুইলার (অটোরিকশা) রিকুইজিশন করা আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূলত মাইক্রোবাস, মিনিবাস বা বড় যানবাহন জনস্বার্থে একটানা অনধিক ৭ দিন রিকুইজিশন করা যাবে। কিন্তু রোগী বহনকারী গাড়ি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গাড়ি এবং বিদেশগামী যাত্রী বহনকারী গাড়ি রিকুইজিশন করা যাবে না।
তবে গাড়ি রিকুইজিশনের অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের প্রোফাইল এবং গ্রুপে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কেউ কেউ। ফেসবুক ঘাঁটলে গাড়ির রিকুইজিশন নিয়ে অসংখ্য প্রতিক্রিয়ামূলক পোস্ট চোখে পড়ে।
ওয়ালিদ শ্রাবণ নাম সম্বলিত ফেসবুক ব্যবহারকারী সম্প্রতি ফেসবুকে লিখেন, আমার একমাত্র পিকআপটা আসন্ন নির্বাচনে রিকুইজিশন দিয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। এটা কোন আইন?
তিনি লিখেন, রাষ্ট্রের কাজে এক-দুই দিনের জন্য গাড়ি নিতে পারেন। যেই গাড়ির উপর ভিত্তি করে ২০ থেকে ২৫ জন মানুষের রুটিরুজি হয়, সেই গাড়ি আপনার অনির্দিষ্টকালের জন্য নেন কোন আইনে?
ব্যক্তিমালিকানাধীন নোয়াহ গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ফেসবুক গ্রুপে অপর এক ব্যক্তি লিখেন, জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে গাড়িটি পিরোজপুর থেকে খুলনায় গেলে খুলনা হাইওয়ে পুলিশ সেই গাড়ি আটকায়। তারপর গাড়ির কাজগপত্রসহ ড্রাইভারের লাইসেন্স জমা নিয়ে ৩১ জানুয়ারি থেকে নির্বাচন পর্যন্ত গাড়ির রিকুইজিশন দেয়।
ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ১২-১৩ দিন গাড়ি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না এবং তার ড্রাইভারেরও এতদিন নির্বাচনের সময়ে গাড়ি চালানো সম্ভব না। কারণ হিসবে তিনি- এতদিন গাড়ি কোথায় রাখবে? কোথায় ডিউটি করাবে? ড্রাইভার কোথায় থাকবে বা কী খাবে?- এসব অনিশ্চয়তামূলক প্রশ্ন রাখেন তিনি।
কেউ কেউ দাবি জানিয়েছেন, এক দিনের জন্য হোক বা ১০ দিনের জন্য হোক, সরকার যদি গাড়ি রিকুইজিশন করে, তাহলে মালিক গাড়ির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন।
২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা ফেসবুকভিত্তিক 'ট্রাফিক অ্যালার্ট' গ্রুপে ঢাকার যানজট থেকে শুরু করে বিআরটিএতে গাড়ির কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণ, নানা বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান হয়। ওই গ্রুপে এখন 'কার রিকুইজিশন' লিখে সার্চ করলেই সাম্প্রতিক সময়ের অনেক পোস্ট সামনে আসে। দেখা যায়, গ্রুপের সদস্যরা একে অপরকে এ নিয়ে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। কেউ জানতে চাচ্ছেন, ঢাকার কোন সড়ক দিয়ে চলাচল করলে গাড়ি রিকুইজিশন এড়ানো যাবে।
ঢাকার একটি কোম্পানির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশ সম্প্রতি তাদের দুটি নোয়াহ গাড়ি পাঁচ দিনের জন্য রিকুইজিশনে নিলেও প্রাইভেট কার নেয়নি। তবে তাদের অভিযোগ, পুলিশ মালিক ও চালকদের অনুমতির তোয়াক্কা না করে জোরপূর্বক গাড়িগুলো রিকুইজিশনে নিচ্ছে।
গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ৩১ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. সাইফুল আলম জানান, নির্বাচন উপলক্ষে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার দূরপাল্লার যানবাহন রিকুইজিশন করেছে ট্রাফিক পুলিশ এবং এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এসময় সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, রিকুইজিশনকৃত গাড়ির ভাড়া, স্টাফদের বেতন এবং জ্বালানি খরচ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে তাদেরকে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য জানানো হয়নি।
মো. সাইফুল আলম বলেন, শহরতলীর একেকটি গাড়ি সাতদিনে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতির মুখোমুখি হবে। আগে আমাদেরকে বলা হতো, বাসপ্রতি এই টাকা মালিক পাবে, এই টাকা স্টাফ পাবে, আর তেল সরকারিভাবে দিবে। কিন্তু এবার এই নিয়মের ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে।
পুলিশ হেডকোয়াটার্সের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশনস-এর এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারি গাড়ির স্বল্পতার কারণে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচনী কাজের জন্যই এখন গাড়ির রিকুইজিশন করা হচ্ছে মূলত।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় প্রায় ১৬ লাখ লোক কাজ করবে। কমিশন হয়তো এই গাড়িগুলোর কিছু দেবে বিজিবিকে, কিছু দিবে সেনাবাহিনীকে, কিছু ব্যবহার করবে অন্যান্য কাজে।
উল্লেখ্য, গাড়ি রিকুইজিশন মানে হলো রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে বা জনস্বার্থে পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক গাড়ি সাময়িকভাবে অধিগ্রহণ করার আইনি প্রক্রিয়া। সাধারণত নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা বিশেষ রাষ্ট্রীয় সফরের সময় এটি করা হয়।