২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৫

আটকে গেল সরকারি চাকরির ১ লাখ পদের নিয়োগ

বাংলাদেশ সরকারের লোগো  © সংগৃহীত

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগ কার্যক্রম আটকে গেছে। আউটসোর্সিং নীতিমালা সংশোধনের পর নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় এসব পদে কর্মী নিয়োগ দিতে পারছে না বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। ফলে হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর ও বাসভবনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সেবাকর্মীর সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা, আর প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের সুইপার, ল্যাব সহকারী, ট্রলিম্যানসহ বিভিন্ন ধরনের সেবাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব আটকে রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের কাজে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা। রেলপথ, সমাজকল্যাণ ও কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধনকে কেন্দ্র করে সমস্যার সূত্রপাত ঘটে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় সংশোধিত নীতিমালা জারি করে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরকে সরাসরি লোক নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ চাইলে অর্থ বিভাগের অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আইআইএফসির মাধ্যমেও লোক নিয়োগ দিতে পারবে।

তবে সংশোধিত নীতিমালায় সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় এ ধরনের সেবা গ্রহণের স্পষ্ট বিধান নেই। সরকারি ক্রয় বিধিমালা বা পিপিআরেও ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি অস্থায়ী নিয়োগের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ যেমন বন্ধ রয়েছে, তেমনি সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

নীতিমালার অস্পষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের জন্য যেসব দরপত্রের কার্যক্রম চলমান রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কী করণীয়, তা সংশোধিত নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়নি। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব আসিব আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, চলমান দরপত্রের বিষয়ে কী করণীয়, তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। তাঁদের বিভাগের অধীন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কয়েক হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের কথা রয়েছে। তবে নীতিমালা স্পষ্ট না থাকায় এসব নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, আইনি জটিলতা নিরসনে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ বিভাগ। গত ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথোরিটির (বিপিপিএ) কাছে পাঠানো চিঠিতে সংশোধিত নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়।

অর্থ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, সরকারি কাজে গতিশীলতা আনা, স্বল্পতম সময়ে সেবা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সাশ্রয় এবং মানসম্মত সেবা কেনার লক্ষ্যে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করা হয়েছে। সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এ আউটসোর্সিংকে ভৌত সেবা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের সেবা নেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নেই। এ কারণে আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নিতে বিপিপিএকে অনুরোধ করা হয়।

বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ অর্থ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে। গত ১৪ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে সংস্থাটি জানায়, আউটসোর্সিং ব্যবস্থা চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সেবাকর্মীদের সরাসরি চুক্তিগত সম্পর্ক এড়ানো। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এসব কর্মীকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি থেকে সম্ভাব্য আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানোও ছিল এর লক্ষ্য।

বিপিপিএর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ চুক্তি করে। সেবাকর্মীরা ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে সরকারি দপ্তরে কাজ করেন। কিন্তু সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তির সুযোগ তৈরি হলে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো বদলে যেতে পারে। এতে আগের আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা আবার দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।