সরকারি চাকরিতে প্রবিধানমালা সংশোধন করে অর্জিত পদোন্নতির অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না: হাইকোর্ট
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করলে পরবর্তী সময়ে প্রবিধানমালা সংশোধন বা বিধি সংশোধন করে করে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধনের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের থাকলেও নতুন বিধি ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্জিত আইনি অধিকার বা সুবিধা কেড়ে নেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাত উপসহকারী প্রকৌশলীর পদোন্নতিসংক্রান্ত রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় দেন হাইকোর্ট। গত ১৯ আগস্ট বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়টি দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লেখেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম।
যে কারণে রিট
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মুহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদারসহ সাতজন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে বারিতে যোগদান করেন। পরে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়।
বারি প্রবিধানমালা, ২০১১ অনুযায়ী, ফিডার পদে পাঁচ বছর চাকরি সম্পন্ন করার পর উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) থেকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির বিধান ছিল। রিট আবেদনকারীরা ২০২১ সালের আগেই ওই প্রবিধানমালা অনুযায়ী পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের চাকরিকাল ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেন।
তবে ২০২১ সালের ৯ মার্চ সরকার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রবিধানমালা, ২০২১ গেজেট আকারে প্রকাশ করে। নতুন প্রবিধানমালার ৩২ নম্বর ক্রমিকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির পরিবর্তে ৩৩ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৬৭ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পদ পূরণের বিধান করা হয়। অন্যদিকে, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল শাখার উপসহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতির শতভাগ কোটা অপরিবর্তিত রাখা হয়।
নতুন প্রবিধানমালার কারণে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় নিজেদের অর্জিত অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগে সাত প্রকৌশলী ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করেন।
দুই পক্ষের যুক্তি
রিট আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ আদালতে যুক্তি দেন, ২০২১ সালের সংশোধিত প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই তার মক্কেলরা পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ করে অধিকার অর্জন করেছিলেন। তাই পরবর্তী সময়ে প্রবিধান সংশোধন করে তাদের পদোন্নতির সুযোগ সীমিত করা আইনত বেআইনি ও বৈষম্যমূলক।
আরও দেখুন: বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিতে জনবল নিয়োগ, আবেদন অনলাইনে
অন্যদিকে, বারির পক্ষে আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন যুক্তি দেন, ২০১১ সালের প্রবিধানমালা রহিত করে ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে রহিত প্রবিধানমালার অধীনে পদোন্নতি দাবি করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে সিভিল শাখায় বিএসসি প্রকৌশলীদের সরাসরি নিয়োগের বিধান করা হয়েছে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, প্রবিধান সংশোধনের আগেই যেসব রিট আবেদনকারী পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন প্রবিধানমালা, ২০২১ ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। তারা আগের প্রবিধানমালা, ২০১১-এর অধীনে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারের অধিকারী। পরবর্তী সময়ে প্রবিধানে পরিবর্তন এনে তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
আদালত আরও বলেন, সংশোধিত প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগে যেসব আবেদনকারী পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করেছিলেন, তাদের পদোন্নতির বিষয়টি পুরোনো প্রবিধানমালা অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে। নতুন কোনো শর্তের কারণে তাদের ইতোমধ্যে অর্জিত যোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে হাইকোর্ট রুলটি নির্দেশনাসহ নিষ্পত্তি করেন। একই সঙ্গে বিবাদীদের নির্দেশ দেন, ২০২১ সালের প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী আবেদনকারীদের ২০১১ সালের প্রবিধানমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
পদের শূন্যতা, যোগ্যতা ও পদোন্নতিসংক্রান্ত অন্যান্য আইনানুগ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এক মাসের মধ্যে এ পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রায় ও আদেশ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহিত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ। বারির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহফুজ বিন ইউসুফ ও আক্তার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।