তিন বিসিএসে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়াদের সংবাদ সম্মেলন
তিন বিসিএসে ভেরিফিকেশনে বাদ যাওয়া ভুক্তভোগীরা সংবাদ সম্মেলন করছেন। আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে তারা কথা বলছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ৪৩, ৪৪ ও ৪৮ বিসিএসে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া ভুক্তভোগীরা অংশ নিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিসিএসের গেজেটবঞ্চিত প্রার্থীরা বলেন, আমরা ৪৩, ৪৪ ও ৪৮তম বিসিএস এর গেজেট বঞ্চিত ক্যাডারবৃন্দ আজ এখানে মিলিত হয়েছি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আমাদের সাথে হয়ে যাওয়া অন্যায়ের কথা আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বিসিএস বাংলাদেশের সকল চাকরির পরীক্ষার মধ্যে দীর্ঘতম এবং কঠিনতম পরীক্ষা। গ্রাজুয়েশন শেষ করে প্রায় ৪ থেকে ৫ বছরের দীর্ঘ অধ্যবসায়ের পর একজন প্রার্থী তার কাঙ্ক্ষিত ক্যাডারে পিএসসির মাধ্যমে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এই একটি চাকরি শুধু একজন প্রার্থীর নয়, একটা পরিবারের দীর্ঘ স্বপ্নের ফল। আমরা করোনাসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই স্বপ্নের চাকরিটিতে যোগদানের আশা করেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, বৈষম্য বিলোপের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসা বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভেরিফিকেশন নামক প্রক্রিয়ার চরমতম অপব্যবহার করে আমাদের চাকরিতে যোগদান হতে বিরত রেখেছে।
তারা বলেন, সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে সম্পন্ন কোটামুক্ত ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে প্রিলিমিনারি, রিটেন ও ভাইভায় উত্তীর্ণ আমরা সকলে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে পিএসসির কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত হই। এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে শুরু হয় পুলিশ ভেরিফিকেশন। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর ২ হাজার ৬৪ জনকে গেজেটভুক্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে যা বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায়ও প্রকাশিত হয়। গেজেট নোটিফিকেশনে আমাদের যোগদানের তারিখ বলা হয় ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর।
এসময় অনেকে কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করার জন্য বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এমনকি ভিন্ন ক্যাডারের চাকরি হতে ইস্তফা দেয়। অনেকে অন্যান্য চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা হতে বিরত থাকে অন্যদের সুযোগ করে দিতে। কিন্তু হঠাৎ করেই নোটিশ জারির মাধ্যমে এই যোগদান পিছিয়ে ২৪ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে ২৫ সালের ১ জানুয়ারি করা হয়। সবাই যখন যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখন যোগদানের মাত্র ২ দিন আগে ২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর গেজেট বাতিল ঘোষণা করে, সেস্থলে নতুন গেজেট প্রতিস্থাপিত হয় যেখানে নতুন গেজেট থেকে বাদ পড়ে ২২৭ জন।
২৫ সালের ২০ মে একটি সম্পূরক গেজেট প্রকাশ করা হয়, যেখানে ২২৭ জনের ১৬২ জন গেজেটভুক্ত হন কিন্তু বাদ পড়েন ৬৫ জন। গেজেট বঞ্চিত আমাদের এই ৬৫ জনের বেশিরভাগেরই পুলিশ ও প্রশাসনিক ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে তথ্যের ভিন্নতা থাকায় আটকে আছে সবার গেজেট। কখনো কোনো রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও গেজেট বঞ্চিত হয় অনেকে। এর মধ্যে অনেকেই অন্যান্য সরকারি চাকরিতে কর্মরত। অনেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বপালন ও করেছে। আমরা জানতে পেরেছি, ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জনশ্রুতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ কারো নামে কিছু শুনলেই সেটা ভেরিফাই না করে লিখে দেওয়া হয়েছে। ভেরিফিকেশনের নগ্ন হস্তক্ষেপে একইভাবে অনেক যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়ে ৪৪তম ও ৪৮তম বিসিএস।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, শুধুমাত্র মেধার ভিত্তিতে বিসিএস ও সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হবে; রাজনৈতিক কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। কিন্তু ৪৪তম বিসিএস এ পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১ম স্থান অধিকার করেও একজন চাকরিতে যোগদান করতে পারেনি। মোট গেজেটবঞ্চিত হয়েছে ২০ জন। ৪৮তম বিসিএস ছিল ডাক্তারদের জন্য বিশেষ বিসিএস। সেখানেও একই মেডিকেলের ১৫ জনসহ মোট বাদ পড়ে ২৩ প্রার্থী।
উল্লেখ্য, এই তিনটি বিসিএস এর বাদ পড়া প্রার্থীদের শুধু রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়েই বাদ দেওয়া হয়েছে এমন নয়; অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সকল গেজেট প্রকাশ পেয়েছে সাম্প্রদায়িকতাও। আবার একটি সংস্থা ইতিবাচক তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করলেও অন্য সংস্থা নেতিবাচক বলায় আটকে থেকেছে গেজেট। সুতরাং এই প্রক্রিয়া যে ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি এবং অন্যায়ভাবে কেউ যেন বঞ্চিত না হয় তাও নিশ্চিত করা হবে।
আমরা এই ইশতেহারের মধ্যে ন্যায়বিচারের আশার আলো খুঁজে পেয়েছিলাম। সম্প্রতি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশন জনিত কারণে প্রায় ২ হাজার ৫০০ প্রার্থী গেজেটবঞ্চিত হয়েছিল। সরকারের তড়িৎ হস্তক্ষেপে তারা আবার গেজেটভুক্ত হয়েছেন। একই ঘটনা ঘটেছে ৪৯তম বিসিএসের ক্ষেত্রেও। বর্তমান সরকারকে আমরা এ কারণে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সরকার গঠনের ৬ মাস অতিবাহিত হলেও আমরা ৩টি ব্যাচ এখনো গেজেটের বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে আমাদের আবেদন— অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সৃষ্টি এই বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়সংগত সমাধানের পথ সুগম করা হোক। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও কার্যকর হস্তক্ষেপে আমাদের দীর্ঘদিনে প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমাদের একই প্রত্যাশা— অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের গেজেটভুক্ত করে প্রজাতন্ত্রের সেবায় আত্মনিয়োগের সুযোগ প্রদান করা হবে। আমরা দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব, মেধা ও শ্রম দিয়ে আন্তরিকভাবে অবদান রাখতে চাই।