০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:৩৪

রোনালদো-মেসির বিদায়, দুই কিংবদন্তির শেষটা দুই রকম

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি  © সংগৃহীত

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবল শাসন করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি। মাঠের লড়াইয়ে কখনো একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, আবার কখনো ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই দুই মহাতারকা। পর্তুগাল ও আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও ছিল অসংখ্য অর্জন, ব্যর্থতা, আবেগ আর স্মরণীয় মুহূর্তে ভরা। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সময় দুজনের পথটা যেন সম্পূর্ণ আলাদা।

বিশ্ব ফুটবলে বছরের পর বছর রাজত্ব করা এই দুই তারকার বিদায়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান মাত্র এক মাসের মতো। কিন্তু বিদায়ের ধরন ও পরিস্থিতিতে বিস্তর পার্থক্যের দেখা মিলল। একজন অনেকটা নীরবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে বিদায় জানিয়েছেন। অন্যজন পরিবার ও হাজারো সমর্থকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে 'আলবিদ্যা' বলেছেন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দেন রোনালদো। নিজের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক ভিডিওতে সিদ্ধান্তের কথা জানান পর্তুগিজ অধিনায়ক। তার এমন ঘোষণায় বিস্মিত হন সমর্থকরা। কারণ, এর আগে জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। মাঠে কিংবা সমর্থকদের সামনে আনুষ্ঠানিক বিদায়ের পরিবর্তে অনেকটা নীরবেই পর্দা নামালেন দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের।

অন্যদিকে লিওনেল মেসির বিদায়ের মুহূর্তটি ছিল আবেগ ও উদ্‌যাপনে ভরা। গত ৬ অক্টোবর পরিবার ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উপস্থিতিতে বিদায় জানান তিনি। প্রিয় তারকাকে সম্মান জানাতে জড়ো হয়েছিলেন হাজারো ভক্ত। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা আর আবেগ। যে খেলোয়াড় আর্জেন্টিনাকে আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফিরিয়ে এনেছেন, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেদিন এক হয়েছিলেন সমর্থকরা। দুই তারকার বিদায়ের সময়ের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও বিদায়ের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

বড় স্বপ্ন নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে যাত্রা শুরু করেছিলেন রোনালদো। তবে একদিন পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা তারকা হয়ে উঠবেন, তা হয়তো শুরুর দিকে কল্পনাও করেননি তিনি।

জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও বড় কোনো শিরোপার দেখা পাচ্ছিল না পর্তুগাল। অবশেষে ২০১৬ সালে রোনালদোর নেতৃত্বে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। দেশটির ফুটবল ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জেতেন রোনালদো।

তবে পর্তুগালের হয়ে তার অবদান কেবল শিরোপা জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে রয়েছেন তিনি। পর্তুগালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলেও গড়েছেন অনন্য এক রেকর্ড। এমন কীর্তি ছুঁতে ভবিষ্যতে অন্যদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিলেও রোনালদোর সামনে এখনো একটি বড় ব্যক্তিগত লক্ষ্য রয়েছে। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ক্যারিয়ারের ১ হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে আর মাত্র ১৫ গোল প্রয়োজন তার। পুরোপুরি অবসরে যাওয়ার আগে এই ঐতিহাসিক অর্জনটি নিজের করে নিতে চান ৪১ বছর বয়সী এই তারকা।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার অবশ্য রোনালদোর পথচলার চেয়ে অনেক বেশি চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জিততে না পারায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে। একের পর এক বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা অধরাই থেকে যাচ্ছিল।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালেও চিলির কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। তিনটি বড় ফাইনালে ব্যর্থ হওয়ার পর মেসিকে ঘিরে সমালোচনা আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।

তবে সেই হতাশাকে পেছনে ফেলে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে ২০২১ ও ২০২৪ সালে দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জিতে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায় দলটি। একই সঙ্গে জেতে ফিনালিসিমার শিরোপাও। একসময়ের সমালোচনা বদলে যায় প্রশংসায়। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করে মেসি পূর্ণতা দেন নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে।

রোনালদো ও মেসির ক্যারিয়ারে মিলের অভাব নেই। দুজনই দীর্ঘদিন বিশ্ব ফুটবলের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার লড়াইয়ে ছিলেন। ব্যক্তিগত অর্জন, রেকর্ড আর শিরোপায় নিজেদের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে তাদের গল্প দুটি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে।

মেসির বিদায়ে ছিল উৎসবের আমেজ। পরিবার, সমর্থক ও সতীর্থদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। দেশের হয়ে প্রায় সব বড় স্বপ্ন পূরণ করার পর তার বিদায়কে ঘিরে ছিল গর্ব ও কৃতজ্ঞতা।

অন্যদিকে রোনালদোর বিদায় এসেছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে। পর্তুগালের নতুন কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে বিরোধ ও জাতীয় দলের ভেতরের টানাপোড়েন তার বিদায়ের সিদ্ধান্তকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। কোচের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় জাতীয় দলের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সব মিলিয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা হয়ে উঠেছে কিছুটা বিতর্কিত।

অথচ পর্তুগালের ফুটবলে রোনালদোর অবদানও কম নয়। দেশটির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের পেছনে তার নেতৃত্ব ও ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। অন্যদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বজয়ের স্বাদ এনে দিয়ে মেসিও নিজের দেশের ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

সব মিলিয়ে রোনালদো ও মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল একটি যুগের গল্প। দুজনের পথচলায় ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অসংখ্য রেকর্ড, শিরোপা আর কোটি ভক্তের আবেগ। কিন্তু শেষ দৃশ্যটি হলো একেবারেই আলাদা। রোনালদোর বিদায়ে ছিল বিস্ময় ও টানাপোড়েনের ছাপ, আর মেসির বিদায়ে ছিল উদ্‌যাপন ও ভালোবাসার আবহ।

শুরুটা দুজনেরই ছিল মহাকাব্যিক, শেষটাও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। বিশ্ব ফুটবল হয়তো আরও অনেক তারকা পাবে, কিন্তু রোনালদো-মেসির এই যুগের পুনরাবৃত্তি যে সহজে হবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।