২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৫৮

ইয়ামাল-এমবাপ্পের এমন ভুলেই কি ব্যালন ডি’অর জেতেন কেইন?

হ্যারি কেইন  © সংগৃহীত

ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের বক্তব্যও আলোচনায় ছিল। মূলত ভোট গ্রহণের সময় নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে দুই তারকার জোরালো মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জেতেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এমবাপ্পে ও ইয়ামালের বক্তব্য কি তাদের জন্য উল্টো ফল বয়ে এনেছিল? যদিও তাদের মন্তব্যের কারণে ভোটের ফল বদলেছে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

গত সেপ্টেম্বরে ফরাসি সংবাদপত্র লেকিপ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা এমবাপ্পে। এই পুরস্কার জেতাকে নিজের স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যগুলোর একটি উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় না, এই মৌসুমে আমার চেয়ে ভালো খেলেছেন কোনো খেলোয়াড়।’

ব্যালন ডি’অর যে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি, সেই যুক্তিও তুলে ধরেছিলেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, অসাধারণ পারফরম্যান্স করা খেলোয়াড়েরাই এই পুরস্কারের দাবিদার। এমনকি বিজয়ী বেছে নেওয়ার সুযোগ পেলে নিজেকেই ভোট দিতেন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে এগিয়ে থাকলেও আলোচ্য মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করা এমবাপ্পে ক্লাব কিংবা জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেননি। ফলে দলীয় সাফল্যের বিবেচনায় তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামনে এগিয়ে থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

এদিকে ব্যালন ডি’অরের মূল্যায়ন নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালও। ক্লাব ও স্পেন জাতীয় দলের হয়ে অসাধারণ মৌসুম কাটানোর কথা উল্লেখ করে তিনি মনে করতেন, পুরস্কার জয়ের দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যথেষ্ট যোগ্যতা তার রয়েছে।

তবে মুভিস্টার প্লাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গোলের সংখ্যাকে ব্যালন ডি’অরের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার বিরোধিতা করেন ইয়ামাল। তার বক্তব্য ছিল, এই পুরস্কার দেওয়া উচিত বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়কে, শুধু ৮০ গোল করা কাউকে নয়। এত গোল করলে সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ব্যালন ডি’অর ভিন্ন ধরনের পুরস্কার। অনেকেই এই পার্থক্য বোঝেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনেকের ধারণা, ইয়ামালের এই মন্তব্য ছিল এমবাপ্পের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত। কারণ, আগের মৌসুমে ব্যক্তিগত গোলের হিসাবে দারুণ ছন্দে ছিলেন ফরাসি তারকা।

এর আগে সেপ্টেম্বরে ইয়ামাল বলেছিলেন, ভোট পাওয়ার জন্য সাংবাদিকদের কাছে তাকে অনুনয় করতে হবে না। বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে নিজের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, পুরস্কার জিতলে সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাবেন।

তবে গোলের সংখ্যা নিয়ে তার পরবর্তী মন্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। এতে এমবাপ্পের পাশাপাশি কেইনেরও অন্যতম শক্তির জায়গা গোল করার সামর্থ্যও প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

এমবাপ্পে ও ইয়ামালের মন্তব্যের ক্ষেত্রে সময়টিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালন ডি’অরের ভোট গ্রহণ চলাকালেই নিজেদের যোগ্যতা ও পুরস্কারের মানদণ্ড নিয়ে বক্তব্য দেন তারা।

বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকা দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী ১০০ জন ক্রীড়া সাংবাদিক। ২৮ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আগে প্রত্যেক সাংবাদিক নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ১০ জন খেলোয়াড়কে বেছে নিয়ে ক্রমানুসারে সাজান।

ফলে দুই তারকার বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ভোটাররা প্রার্থীদের পারফরম্যান্স ও যোগ্যতা মূল্যায়ন করছিলেন। এ কারণে তাদের মন্তব্যের ধরন ভোটারদের মনে কোনো প্রভাব ফেলেছিল কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কিছু ভোটারের কাছে নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে বারবার জোর দেওয়া প্রচারণা চালানো কিংবা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা বলে মনে হয়ে থাকতে পারে। তবে এমন প্রতিক্রিয়া বাস্তবে ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছিল কিনা, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

এমবাপ্পে ও ইয়ামালের তুলনায় কেইনের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি সংযত। নিজের যোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে না গিয়ে নিজের পারফরম্যান্স, সতীর্থদের অবদান এবং বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ডের সাফল্যের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

স্প্যানিশ সংবাদপত্র মার্কা-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কেইন জানান, নিজের সম্পর্কে বেশি কথা বলতে তার ভালো লাগে না। আগের মৌসুমকে ব্যক্তিগত ও দলীয়—দুই দিক থেকেই ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম হিসেবে উল্লেখ করেন ইংলিশ স্ট্রাইকার।

মৌসুমজুড়ে ৭৩ গোল করার কথা তুলে ধরে তিনি সতীর্থ ও তাকে সহায়তা করা সবাইকে কৃতিত্ব দেন। একইসঙ্গে ব্যালন ডি’অরের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও সম্মান জানান কেইন। তার মতে, অসাধারণ মৌসুম কাটানো একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে সেরাকে বেছে নেওয়া কঠিন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সাংবাদিকদের, তাদের মূল্যায়নও তার নিয়ন্ত্রণে নেই।

নিজেকে একমাত্র যোগ্য দাবিদার হিসেবে তুলে না ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাফল্যও স্বীকার করেন কেইন। তার এই অবস্থান তাকে আত্মবিশ্বাসী, তবে সংযত একজন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছে।

পরিসংখ্যানের বিচারে কেইনের দাবিও ছিল শক্তিশালী। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ৬১ গোল করেন তিনি। একই সময়ে ক্লাব প্রতিযোগিতায় রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এমবাপ্পে করেন ৪২ গোল, আর বার্সেলোনার হয়ে ইয়ামালের গোল ছিল ২৪টি।

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে গোল যোগ করার পর কেইনের মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭৩। ৬৫ ম্যাচে তার অ্যাসিস্ট ছিল ৮টি। পাশাপাশি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতেন তিনি। এর পাশাপাশি বায়ার্নের জার্মান লিগ, জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপ জয়ে অবদান রাখেন।

ব্যালন ডি’অরের মূল্যায়নে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলীয় সাফল্য ও শিরোপাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। খেলোয়াড়ের আচরণ ও ক্রীড়াসুলভ মানসিকতাও বিবেচনার অংশ। সেই হিসাবে ব্যক্তিগত অর্জনের সঙ্গে দলীয় সাফল্যের সমন্বয় ছিল কেইনের পক্ষে।

অন্যদিকে, বড় শিরোপা না জেতায় এমবাপ্পের ক্ষেত্রে দলীয় সাফল্যের যুক্তি তুলনামূলক দুর্বল ছিল। ইয়ামালও গোলসংখ্যায় কেইনের কাছাকাছি ছিলেন না। তবে গোল তৈরিতে তার অবদান এবং বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে শিরোপা জয়ের সাফল্যও ছিল আলোচনায়।

এমবাপ্পে ও ইয়ামালের বক্তব্য সরাসরি কেইনের ব্যালন ডি’অর জয়ের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। তবে ভোট গ্রহণের সময় তাদের মন্তব্য কিছু ভোটারের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেছিল কি না, সেই প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।

নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে দুই তারকার জোরালো অবস্থান কারও কাছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে থাকতে পারে। বিপরীতে, নিজের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সতীর্থ ও দলীয় সাফল্যকে গুরুত্ব দিয়ে কেইন তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছিলেন।