অবসরের পর যে পরিচয়ে স্মরণীয় হতে চান লিওনেল মেসি
ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সব অর্জনই তার হাতে ধরা দিয়েছে। ৮টি ব্যালন ডি’অর, ৪টি চ্যাম্পিয়নস লিগ আর বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবেও নাম উঠেছে লিওনেল মেসির। তবু এত অর্জনের পরও নিজের উত্তরাধিকারকে শুধু ট্রফি আর রেকর্ডের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখতে চান না আর্জেন্টাইন এই মহাতারকা। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাকে মনে রাখুক একজন লড়াকু মানুষ হিসেবে, যিনি কিনা স্বপ্ন পূরণে কখনো হাল ছাড়েননি। মেসির কাছে দিন শেষে বড় হয়ে উঠেছে জয়ের উল্লাস নয়, বরং লক্ষ্যে পৌঁছানোর সেই নিরন্তর সংগ্রাম।
প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একের পর এক নতুন অধ্যায় লিখেছেন মেসি। মাঠে পা রাখা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। বার্সেলোনায় রেকর্ড গড়ার দিনগুলো থেকে শুরু করে ইন্টার মায়ামিতে সাম্প্রতিক সময়ের পারফরম্যান্স—প্রতিটি পর্যায়েই এমন ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন এই ক্ষুদ্রাকৃতির প্লেমেকার, যা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়।
২০২৬ সালের প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ডে ক্রীড়া বিভাগে বিজয়ী নির্বাচিত হয়েছেন আর্জেন্টাইন এই মহাতারকা। এর মধ্য দিয়ে প্রথম ব্যক্তিগত ফুটবলার হিসেবে এই সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। মাঠের অসাধারণ নৈপুণ্যের পাশাপাশি তার দাতব্য কর্মকাণ্ডকেও স্বীকৃতি দিয়েছে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ফাউন্ডেশন। বিশেষ করে লিও মেসি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীরা তাকে কীভাবে মনে রাখুক, এমন প্রশ্নের জবাবে মেসি সরে এসেছেন সেই পরিসংখ্যাননির্ভর আলোচনা থেকে, যা প্রায়ই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় বা ‘জিওএটি’ বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আগে ওভিডোয় স্প্যানিশ সংবাদ সংস্থা ইএফইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, 'তিনি চান, একজন অসাধারণ ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাকে স্মরণ করা হোক, যিনি নিজের লক্ষ্য ও স্বপ্ন পূরণের জন্য সব সময় লড়াই করেছেন।'
মেসির এই বক্তব্যে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত ফলাফলের চেয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তার মতে, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই তাকে সবচেয়ে বেশি সংজ্ঞায়িত করে।
৮টি ব্যালন ডি’অর ও ৪টি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপাসহ অসাধারণ এক অর্জনের তালিকা থাকলেও মেসি ভালোভাবেই জানেন, ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে সামান্য ব্যবধানেই ভাগ্য নির্ধারিত হয় এবং হতাশাও নিত্যসঙ্গী।
সাক্ষাৎকারে মেসি আরও বলেন, “কখনো আমি যা চেয়েছি, তা অর্জন করতে পেরেছি; কখনো পারিনি... কিন্তু আমার সামনে যা কিছু জয়ের জন্য ছিল, সেসব জেতার চেষ্টা আমি কখনো বন্ধ করিনি।”
তার এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়, অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী একজন খেলোয়াড়ের পথচলাতেও বাধাবিঘ্নের অভাব থাকে না। নিজের হাল না ছাড়ার মানসিকতার ওপর জোর দিয়ে মেসি মূলত তরুণ ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত রেখে যেতে চান। পেশাদার ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র চাপ ও অনিবার্য ব্যর্থতার মুখে যারা হিমশিম খায়, তাদের জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে অনুপ্রেরণা।
মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পেছনে এই মানসিকতাই যে বড় চালিকাশক্তি, তা স্পষ্ট। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে মেজর লিগ সকারে খেললেও ইন্টার মায়ামির হয়ে প্রতিটি ম্যাচে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মানসিকতার ছাপ দেখা যায়। ফলাফলের চেয়ে প্রচেষ্টাকে মূল্য দেওয়ার মাধ্যমে তিনি এমন এক প্রেরণা ধরে রাখতে পেরেছেন, যা তার সমসাময়িক অনেক খেলোয়াড় বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছেন।
নিজের ক্রীড়াজীবনের ইতিহাসে পদক বা ট্রফির সংখ্যার চেয়ে এই নিরলস প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়কেই স্থায়ী অবদান হিসেবে রেখে যেতে চান মেসি।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে মেসির দীর্ঘ ও অনেক ক্ষেত্রে বেদনাদায়ক সম্পর্কের দিকে তাকালেই তার এই অধ্যবসায়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সাফল্যের যুগ শুরু হওয়ার আগে বড় টুর্নামেন্টের একের পর এক ফাইনালে হৃদয়বিদারক পরাজয়ের স্বাদ পেতে হয়েছিল আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে।
তবে ২০২১ সাল থেকে বদলে যেতে থাকে সেই গল্প। ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকা জয়ের পর আসে ফিনালিসিমার শিরোপা এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক সাফল্য। আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের রেকর্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে থাকা মেসির জন্য এসব অর্জন ছিল ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে প্রমাণ করার উপলক্ষ।
তবে পরাজয়ও তার গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের কাছে হেরেছে আর্জেন্টিনা। সেই পরাজয় এবং ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের অভিজ্ঞতাকে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া ও তা মেনে নেওয়ার শিক্ষা হিসেবে দেখেছেন মেসি।
আন্তর্জাতিক মঞ্চের এসব অভিজ্ঞতা জয়-পরাজয় সম্পর্কে মেসির দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও পরিণত করেছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন, বিশ্ব সাধারণত বিজয়ীদেরই মনে রাখে। তবে নিজের ভেতরের তৃপ্তি আসে এই উপলব্ধি থেকে যে মাঠে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া হয়েছে।
ইন্টার মায়ামির হয়ে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংগ্রামের গুরুত্ব নিয়েও কথা বলছেন মেসি। তার মতে, আধুনিক ফুটবলের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে জয় পাওয়া অত্যন্ত কঠিন—এমনকি সবচেয়ে প্রতিভাবান দলগুলোর জন্যও।
বড় ফাইনালে হারের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মেসি বলেন, “ফুটবলে জেতা খুব কঠিন, আর এই যাত্রাকে মূল্যায়ন করতে হয়, কারণ শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি দলই জিততে পারে।”