২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৫৫

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নাকি ইউরোপসেরা—ব্যালন ডি’অর দৌড়ে এগিয়ে কে?

ইয়ামাল, মেসি, এমবাপ্পে, খভিচা ও কেইন  © সংগৃহীত

আর মাত্র কয়েকদিন পরই জানা যাবে, এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীর নাম। তবে এর আগেই আলোচনায় ভিন্ন এক বিষয়। মূলত লামিনে ইয়ামাল ও খভিচা কাভারাস্কেলিয়ার তুলনা ফুটবলজগতের এক বৈপরীত্য তত্ত্ব সামনে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে ইউরোপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনকারী খেলোয়াড়ই যে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন, এমন নয়। একইভাবে, সবচেয়ে মুগ্ধকর প্রতিভার অধিকারী হলেই যে তিনি পুরো মৌসুমের সেরা রেকর্ডের মালিক হবেন, এরও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বার্সেলোনার রত্ন এবং বিশ্বের অন্যতম রোমাঞ্চকর প্রতিভা ইয়ামাল গণমাধ্যম ও সমর্থকদের বিপুল আগ্রহ নিয়ে ব্যালন ডি’অরের অনুষ্ঠানে প্রবেশ করছেন। অন্যদিকে, কাভারাস্কেলিয়ার অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) হয়ে ইউরোপের একটি অসাধারণ মৌসুম কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু এরপরই তাকে কঠিন ধাক্কা পেরোতে হচ্ছে। দুই দলের সর্বশেষ ম্যাচে তার হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট (এসিএল) ছিঁড়ে যায়। আর সেটি ঘটেছিল ঠিক সেই খেলোয়াড়ের চোখের সামনেই, যাকে এই পুরস্কারের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে ঘিরে সবার মনোযোগ।

কাভারাস্কেলিয়ার চোটের প্রতি সহানুভূতি কিংবা ইয়ামালের প্রতিভা নিয়ে মুগ্ধতা—এসবের বাইরে এই তুলনা আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আনে। কোন বিষয়টি একজন খেলোয়াড়কে ব্যালন ডি’অরের কাছাকাছি নিয়ে যায়? অর্জন? ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স? প্রতিভা? নাকি জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের আলোচনায় বড় জায়গা দখল করার সক্ষমতা?

যদিও বিশেষ একটি ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে এগিয়ে কাভারাস্কেলিয়া। সেটি হলো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ। ইউরোপের শিরোপাজয়ী দলের হয়ে জর্জিয়ান এই ফুটবলার শুধু ভালো খেলোয়াড়ই ছিলেন না; পিএসজির শিরোপা জয়ের অন্যতম প্রধান কারণও ছিলেন তিনি। প্রতিযোগিতাটিতে তার গোলসংখ্যা ১০ এবং অ্যাসিস্ট ৬। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই উয়েফা তাকে প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করে।

এই পরিসংখ্যান ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতায় তাঁর সরাসরি অবদানের প্রমাণ দেয় এবং ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে কাভারাস্কেলিয়াকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখে। শুধু দলীয় সাফল্যই যথেষ্ট নয়। তবে এর সঙ্গে যদি এমন উচ্চমানের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যুক্ত হয়, তাহলে একটি মৌসুমকে শুধু স্বর্ণপদক কিংবা ইউরোপীয় শিরোপার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে ইয়ামাল একই মাত্রার প্রভাব রাখতে পারেননি। এতে তার কারিগরি দক্ষতা কিংবা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের সামর্থ্য কোনোভাবেই খাটো হয় না। তবে এটি দেখিয়ে দেয়, দুজনের তুলনা একমুখী নয় এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় কাভারাস্কেলিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব নিছক আবেগনির্ভর ধারণা নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে একটি অসাধারণ মৌসুমের পরিসংখ্যান ও পারফরম্যান্স।

স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ ছুঁয়েছেন ইয়ামাল। জাতীয় দলের পর্যায়ে ফুটবলে এর চেয়ে বড় কোনো শিরোপা নেই। এত বড় একটি টুর্নামেন্ট একজন খেলোয়াড়কে মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিতে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করার অসাধারণ সুযোগও করে দেয়।

তবে ব্যক্তিগত মূল্যায়নের প্রতিটি প্রশ্নের তৈরি উত্তর হিসেবে এই শিরোপাকে বিবেচনা করা উচিত নয়। বিশ্বকাপ জেতা বিশাল অর্জন। কিন্তু এর অর্থ এই না যে ওই খেলোয়াড়ই টুর্নামেন্টের সেরা ছিলেন। একইভাবে, কোনো প্রতিযোগিতায় সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে না পারলেও ক্লাবের হয়ে অসাধারণ একটি মৌসুম কাটানোর কৃতিত্ব মুছে যায় না।

এখানেই জর্জিয়ান খেলোয়াড়কে ঘিরে বৈপরীত্যটি সামনে আসে। কাভারাস্কেলিয়া বিশ্বকাপেই অংশ নিতে পারেননি, কারণ তার দেশ টুর্নামেন্টে জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে বিশ্বব্যাপী দর্শকের সামনে নিজেকে তুলে ধরার এমন একটি মঞ্চ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন, যা ভোটার ও সমর্থকদের সামনে তাকে আরও বেশি পরিচিত হওয়ার অতিরিক্ত সুযোগ দিতে পারত।

এর কোনোটির জন্যই খেলোয়াড় নিজে দায়ী নন। আন্তর্জাতিক ফুটবল এমন বৈষম্য তৈরি করে—কিছু তারকা সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান, অথচ অন্য সবার সেই মঞ্চে পৌঁছানোর সক্ষমতা বা সুযোগ থাকে না।

ইয়ামাল এখন গণমাধ্যমে অসাধারণ মনোযোগ পাচ্ছেন, আর সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। লিওনেল মেসির পর বার্সেলোনার সবচেয়ে আলোচিত প্রতিভা তিনি। বস্তুনিষ্ঠভাবেও তিনি এমন এক পূর্ণাঙ্গ ফুটবলীয় গল্প, যা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। তার কম বয়স, চোখ-ধাঁধানো দক্ষতা, স্বতন্ত্র শৈল্পিক ব্যক্তিত্ব এবং বিপুল সমর্থকগোষ্ঠী ও তারকা তৈরির দীর্ঘ ইতিহাস থাকা একটি ক্লাবের জার্সি—সবকিছুই তাকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।

ইয়ামালের প্রতিটি ভালো ম্যাচ আলোচনা ও বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে ওঠে। তার প্রতিটি অসাধারণ স্পর্শের দৃশ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই অবস্থান যে অবশ্যই পরিকল্পিত কোনো গণমাধ্যম প্রচারণার ফল, তা নয়। তার প্রতিভা বাস্তব এবং তার পারফরম্যান্সও এই মনোযোগের যৌক্তিকতা তৈরি করে। তবে মনোযোগের এই বিপুল ব্যাপ্তি নিজেই একটি প্রভাব তৈরি করে। ফলে জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের চিন্তায় খেলোয়াড়টি সব সময় উপস্থিত থাকেন।

কাভারাস্কেলিয়ার গল্পটি ভিন্ন। চ্যাম্পিয়নস লিগে অসাধারণ মানের পারফরম্যান্স দেখানো সত্ত্বেও তিনি একই ধরনের আলোচনার গতি ও ব্যাপকতা পাননি। জর্জিয়ায় তার শিকড় এবং ফুটবলের বড় শক্তিগুলোর মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘ ইতিহাস না থাকা দেশটির পরিচয় বার্সেলোনা তারকার তুলনায় তার জনপরিচিতি ও গণমাধ্যমে উপস্থিতি সীমিত থাকার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে তার জাতীয়তাই পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা নির্ধারণ করেছে, কিংবা তার প্রতি ইচ্ছাকৃত অবিচার করা হচ্ছে। তবে খেলোয়াড়দের নিজেদের গল্প বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ ও মঞ্চের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে, তা নিয়ে যুক্তিসংগত বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।