০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:১৪

অবসরের পর কী করবেন মেসি?

লিওনেল মেসি  © সংগৃহীত

শেষের পথে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচটিই আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে। জাতীয় দলের হয়ে মেসির ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হবে এটি। এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে বিদায় নেবেন তিনি।

তবে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও এখানেই শেষ হচ্ছে না মেসির ফুটবলযাত্রা। বরং খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে নতুন এক অধ্যায় তৈরি করছেন তিনি; যেখানে তাকে ক্লাব মালিক, বিনিয়োগকারী, তরুণ প্রতিভার পৃষ্ঠপোষক এবং ফুটবল প্রকল্পের সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে দেখা যেতে পারে।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনার পাশাপাশি মেসিকেই সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড গড়ে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন, যা পুনরাবৃত্তি করা প্রায় অসম্ভব।

গত ৩১ আগস্ট আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের মাত্র ৬ সপ্তাহ পর আসে সেই ঘোষণা। মেসির ভাষ্য ছিল, জাতীয় দলকে দেওয়ার মতো তার আর কিছু নেই।

তবে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তখনই তাকে সিদ্ধান্ত বদলের সুযোগ দিয়েছিলেন। তার মতে, মেসি চাইলে ফিরে আসতে পারেন এবং এই পর্যায়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাটা কোনোভাবেই লজ্জার বিষয় নয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সবকিছুই ইঙ্গিত করছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির অধ্যায় সত্যিই শেষের পথে।

এখনই ক্লাব ফুটবল ছাড়ছেন না মেসি

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে গেলেও ক্লাব ফুটবল ছাড়ার কোনো তাড়াহুড়া নেই মেসির। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তার ২০২৮ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চুক্তি আছে। অবশ্য চুক্তিটি প্রতি বছর পর্যালোচনার সুযোগও থাকছে।

মেসির ঘনিষ্ঠদের ধারণা, নির্ধারিত সময়সীমা আসার আগে মায়ামি ছাড়বেন না তিনি। শারীরিক ও মানসিকভাবে খেলা চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় থাকলে চুক্তি আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে ২০২৮ সালের পর কী করবেন, সে বিষয়ে নিজে এখনো কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি মেসি। ক্যারিয়ারজুড়েই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক দূরের পরিকল্পনার চেয়ে পরবর্তী ম্যাচ ও পরবর্তী চ্যালেঞ্জকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে তার ভবিষ্যতের একটা ছবি এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

ফুটবল থেকে তার পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বরং ফুটবলের সঙ্গে থেকেই ব্যবসা ও বিনিয়োগে নিজের পরিধি আরও বাড়াতে চান মেসি। ইতিমধ্যে মাঠের বাইরেও তার সাম্রাজ্য গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

কোচ নয়, মালিক হতে চান মেসি

স্পোর্টিং ডিরেক্টর কিংবা কোনো ক্লাব সভাপতির উপদেষ্টা হওয়ার প্রতি মেসির আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকতে চান তিনি। তবে প্রতিদিনের ভ্রমণ, ফোনকল, মিটিং এবং প্রশাসনিক চাপের জীবন তার পছন্দ নয়।

সম্প্রতি তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোচ হওয়া নাকি ক্লাবের মালিক হওয়া; কোন ভূমিকাটি তিনি পছন্দ করবেন? মেসির উত্তর ছিল স্পষ্ট, মালিক হতে চান তিনি।

কারণটাও তার কাছে পরিষ্কার। একজন কোচকে প্রতি সপ্তাহে ফলাফলের চাপ সামলাতে হয়। ম্যাচের প্রস্তুতি, খেলোয়াড়ের চোট, নানা সংকট এবং সমালোচনা—সবকিছুর মধ্যেই তাকে কাজ করতে হয়। অন্যদিকে, একজন মালিক তুলনামূলক শান্ত অবস্থান থেকে ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদি গতিপথ নির্ধারণ করতে পারেন।

তবে মেসি কেবল মালিক হতে চান না; বরং ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, খুঁটিনাটি বিষয় এবং পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি—সবকিছুর সঙ্গেই যুক্ত থাকতে চান তিনি।

স্পেনে মেসির ফুটবল সাম্রাজ্যের শুরু

স্পেনেই ইতিমধ্যে নিজের ফুটবল প্রকল্পের ভিত্তি গড়ে তুলতে শুরু করেছেন মেসি। বার্সেলোনার উপকণ্ঠে অবস্থিত পঞ্চম বিভাগের ক্লাব ইউই কর্নেয়া তার প্রকল্পের প্রথম দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গত এপ্রিলে ক্লাবটির মালিকানা নেন মেসি। তরুণ প্রতিভা গড়ে তোলার জন্য ক্লাবটিকে একটি ‘ইনকিউবেটর’ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর আরও বড় পদক্ষেপ এসেছে সিডি এলদেনসেকে ঘিরে।

স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগে খেলা ক্লাবটির মালিকানা মেসির হাতে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে গত ১ অক্টোবর। তবে মালিকানা হস্তান্তরের জন্য স্পেনের উচ্চতর ক্রীড়া পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো প্রয়োজন।

মেসির পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে এলদেনসে থাকতে পারে। যদিও এই মৌসুমে ক্লাবটির তাৎক্ষণিক লক্ষ্য খুব সাধারণ—অবনমন এড়ানো। এই লক্ষ্যেই সাবেক ভিয়ারিয়াল কোচ হাভি কায়েহা দায়িত্ব নিয়েছেন।

মেসির আস্থাভাজন কয়েকজন ব্যক্তি আপাতত দুটি ক্লাব পরিচালনায় তার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তারা মেসি ও ক্লাবগুলোর মধ্যে সংযোগ হিসেবে থাকবেন, যতদিন না মেসি নিজে আরও সক্রিয়ভাবে প্রকল্পে যুক্ত হতে পারেন। তবে তিনি শুধু দূর থেকে ফলাফল দেখছেন না। নিজের কম্পিউটারে নিয়মিত এলদেনসের ম্যাচও দেখেন মেসি।

নতুন মালিক হিসেবে তার প্রথম বার্তাও রেয়াল ওভিয়েদোর বিপক্ষে এলদেনসের ৪-১ গোলের জয়ের পর এসেছিল। নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে মেসি লিখেছিলেন, ‘আউপা দেপোর্তিভো’—অর্থাৎ, ‘চলো দেপোর্তিভো’ বা ‘এগিয়ে চলো দেপোর্তিভো’।

মেসির নামেই স্পনসরদের ভিড়

মেসির মালিকানা এলদেনসের বাণিজ্যিক আকর্ষণও দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ১২টি কোম্পানি ক্লাবটির স্পনসর হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে এমন ব্র্যান্ডও রয়েছে, যারা আগের মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেও চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। এ ছাড়া মেসির সঙ্গে আগে থেকেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও ক্লাবটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে উরুগুয়েতেও প্রকল্প

শুধু স্পেন নয়, উরুগুয়েতেও মেসির ফুটবল প্রকল্প রয়েছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে ২০২৫ সালের মে মাসে দেপোর্তিভো এলএসএম প্রতিষ্ঠা করেন তারা। প্রথম মৌসুমেই উরুগুয়ের তৃতীয় বিভাগে উন্নীত হয় দলটি।

প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন দেশে একাধিক ক্লাব নিয়ে বড় একটি নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন বিভাগে দলগুলো পরিচালনা করার বিপুল খরচের কারণে সেই পরিকল্পনা এখন আর মূল লক্ষ্য নয় মেসির। এখন তার প্রধান মনোযোগ এলদেনসেকে স্পেনের ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত করার দিকে।

অবসরের পর মায়ামিতেও মালিকানা

মেসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ইন্টার মায়ামিও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। ক্লাবটির সঙ্গে তার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, অবসর নেওয়ার পর মায়ামির মালিকানায় একটি অংশীদারিত্ব পাবেন মেসি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের নতুন কোনো ক্লাব প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা বর্তমানে নেই আর্জেন্টাইন মহাতারকার।

নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে ফেরার সম্ভাবনা কতটা?

মেসির শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের সঙ্গে তার আবেগের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে আর্জেন্টিনায় ফিরে গিয়ে ক্লাবটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।

লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে মাতে পান করতে বসে হয়তো এমন কোনো চিন্তা মেসির মাথায় আসতে পারে। একইভাবে বার্সেলোনায় ফেরার কিংবা দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে জড়িয়ে থাকা নাপোলিতে স্বল্পমেয়াদে খেলার চিন্তাও হয়তো তার মনে উঁকি দিতে পারে। তবে মেসির ঘনিষ্ঠদের ধারণা, এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তার বর্তমান পরিকল্পনা মূলত ইউরোপ ও মায়ামিকেন্দ্রিক। পরিবারের জন্য বার্সেলোনার কাছাকাছি সমুদ্রতীরবর্তী কাস্তেলদেফেলসকেও আদর্শ জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এটিই মেসির পছন্দের জায়গাগুলোর একটি।

তরুণদের ফুটবলেও বড় ভূমিকা রাখতে চান

ক্লাব মালিকানা মেসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও যুব ফুটবলের প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর। এখানেও নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর ‘মেসি কাপ’-এ মোট ১৬টি একাডেমি অংশ নিচ্ছে, এর মধ্যে মেসির শৈশবের ক্লাবটিও রয়েছে।

এই টুর্নামেন্টে শুধু নিজের নাম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়াতেই মেসির আগ্রহ সীমাবদ্ধ নয়। তিনি তার ছেলের ম্যাচ এবং বয়সভিত্তিক ফুটবলের বিভিন্ন কার্যক্রম অনুসরণ করেন। বিবিসি স্পোর্টের তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের প্রতিযোগিতায় নিজের সময় ও অর্থের একটি অংশও ব্যয় করেন মেসি।

‘মেসি কাপ’ মাত্র ৮টি দল নিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু গত বছর আয়োজকদের চমকে দেন তিনি।

ধারণা করা হয়েছিল, মেসি হয়তো একটি-দুটি ম্যাচ কিংবা সর্বোচ্চ ফাইনাল দেখতে আসবেন। কিন্তু তিনি পুরো টুর্নামেন্টে উপস্থিত থেকে প্রতিটি ম্যাচ অনুসরণ করেন।

এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৬। আগামী ২৫ অক্টোবর ফ্লোরিডায় ইন্টার মায়ামির নিজস্ব স্থাপনায় এবারের প্রতিযোগিতা শুরু হবে।

অংশগ্রহণকারী দলগুলোর তালিকায় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, চেলসি, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, আর্সেনাল এবং ইউই কর্নেয়াসহ বেশ কয়েকটি বড় ক্লাব ও একাডেমি রয়েছে।