জাতীয় দলে কি খেলবেন রোনালদো, বাড়ছে রহস্য
ডেনমার্কের বিপক্ষে পর্তুগালের ম্যাচের আগে দলীয় অনুশীলন ক্যাম্প থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আকস্মিক বিদায় একাধিক প্রশ্নের জন্ম জাগছে। তবে এরই মধ্যে কিছু উত্তরও মিলেছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পর্তুগালের ক্যাম্প ছাড়েন বিশ্বখ্যাত এই তারকা। তার বিদায়ের আগে পর্তুগালের প্রধান কোচ হোর্হে জেসুস বিস্ফোরক এক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ডেনমার্কের বিপক্ষে পর্তুগালের নেশন্স লিগের ম্যাচে রোনালদোকে দলে রাখা হবে না।
ফলে নেশন্স লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল এখন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ও অধিনায়ক রোনালদোকে ছাড়াই প্রতিযোগিতার তৃতীয় ম্যাচে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে মাঠে নামবে।
এদিকে নেশন্স লিগের ম্যাচের আগের দিন জেসুসের সঙ্গে বিরোধের পর পর্তুগালের অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই অধিনায়কের বুধবার কোপেনহেগেনের পারকেন স্টেডিয়ামে সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন করার কথা ছিল। কিন্তু জেসুসের সংবাদ সম্মেলনের পর তিনি আকস্মিকভাবে ক্যাম্প ছেড়ে যান।
সে সময়ে জেসুস জানিয়েছিলেন, রোনালদো স্বাভাবিকভাবেই অনুশীলন করবেন। কিন্তু দলের বাসে করে স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর পরও রোনালদো সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নামেননি।
জেসুসের সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দলের ব্যাকরুম স্টাফের দুই সদস্যের সঙ্গে পারকেন স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন রোনালদো।
পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে, রোনালদোর ব্যক্তিগত বিমান কোপেনহেগেনের দিকে যাচ্ছিল।
অন্যদিকে স্প্যানিশ ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম মার্কার প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যক্তিগত বিমানে মাদ্রিদের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পরিকল্পনা ছিল রোনালদোর।
এদিকে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ) নিশ্চিত করেছে যে রোনালদো ক্যাম্প ছেড়েছেন। তবে তারা জানিয়েছে, ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচ এবং রবিবার ঘরের মাঠে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের প্রস্তুতি বাকি ২৪ খেলোয়াড়কে নিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী চলবে।
এরপর রোনালদোকে ছাড়াই পর্তুগাল দল হোটেলে পৌঁছায়। দলের সঙ্গে ছিলেন না কোচ জেসুসও। তখনও রোনালদো ও জেসুস—দুজনের অবস্থানই অজানা ছিল।
এর আগে জেসুস জানিয়েছিলেন, রবিবার নরওয়ের বিপক্ষে পুরো ম্যাচ বেঞ্চে থাকা রোনালদো বৃহস্পতিবার ডেনমার্কের বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচেও শুরু থেকে খেলবেন না।
তবে এর আগে জেসুস জোর দিয়ে বলেছিলেন, রোনালদোর সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। একই সঙ্গে ৭২ বছর বয়সী এই কোচ স্বীকার করেছিলেন, নরওয়ের বিপক্ষে নেশন্স লিগের জয়ে বেঞ্চে বসে থাকতে হওয়ায় তার অধিনায়ক হতাশ হয়েছিলেন।
এদিকে ক্যাম্প ছাড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান রোনালদো। ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, “জাতীয় দলের ম্যানেজারের সংবাদ সম্মেলনের পর এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পর আমি জাতীয় দলের অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি আরও লেখেন, “উপযুক্ত সময়ে আমি পুরো পর্তুগিজ জনগণকে জাতীয় দল ছাড়ার কারণ সম্পর্কে সত্যটা জানাব। এই দলের প্রতি আমি সবসময়ই নিবেদিত ছিলাম।”
এরপর রোনালদো বলেন, “এখন পর্তুগাল এবং আমার সব সতীর্থকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই শুভকামনা জানানোর সময়।”
“রোনালদো ক্যাম্প ছেড়েছেন”, এফপিএফ ও রোনালদো নিজে বিষয়টি নিশ্চিত করার আগে জেসুস প্রথমে তা অস্বীকার করেছিলেন।
নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ের পর রোনালদোর সরাসরি ড্রেসিংরুমে চলে যাওয়া এবং দলের সঙ্গে জয় উদ্যাপন না করার বিষয়েও কথা বলেন জেসুস।
এ নিয়ে জেসুস বলেছিলেন, “যেকোনো খেলোয়াড় আর আমিও একসময় খেলোয়াড় ছিলাম, যখন ২০ বা ৩০ মিনিট ধরে গা গরম করার পরও মাঠে নামার সুযোগ পায় না, তখন কেউই খুশি থাকে না।”
পর্তুগালের কোচ আরও জানান, ম্যাচের আগে তিনি রোনালদোকে বলেছিলেন যে তাকে মূল একাদশে রাখা হবে না। তবে ম্যাচের শেষ দিকে তাকে মাঠে নামানো হতে পারে।
“এরপর কোচ হিসেবে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাকে মাঠে নামাব না। এটা নিয়ে এত হইচই করার কিছু নেই,” জোর দিয়ে বলেন জেসুস।
সাবেক বেনফিকা কোচ আরও ব্যাখ্যা করেন, মঙ্গলবার রোনালদো অনুশীলন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমের এমন দাবি সঠিক নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শারীরিক ‘মোবিলিটি’ ও ‘স্ট্রেন্থেনিং’ অনুশীলনের জন্য রোনালদোকে আলাদাভাবে কিছু ব্যায়াম করতে হয়েছিল।
পর্তুগালের হয়ে ২৩ বছরের ক্যারিয়ারে এই প্রথমবার রোনালদো কোনো অনুশীলন ক্যাম্প এভাবে ছেড়ে গেলেন। তবে তার এই বিদায় ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডের অধিনায়ক রয় কিন ও কোচ মিক ম্যাকার্থির মধ্যকার বহুল আলোচিত ‘সাইপান ঘটনা’র তুলনায় তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল।
সাইপানে অনুশীলনের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন রয় কিন। কয়েকদিন পর বিষয়টি নিয়ে দলের বৈঠকে ম্যাকার্থি তার কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন কিন তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “খেলোয়াড় হিসেবে তোমাকে আমি পছন্দ করতাম না, কোচ হিসেবেও করি না, আর ব্যক্তি হিসেবেও করি না।” এরপর তিনি মাঠ ছেড়ে চলে যান।
কিন আর ওই বিশ্বকাপে খেলেননি। পাশাপাশি তিনি বলেছিলেন, ম্যাকার্থির অধীনে আর আয়ারল্যান্ডের হয়ে খেলবেন না।
এদিকে নিজের অবসর পরিকল্পনা নিয়ে গত আগস্টে মন্তব্য করে নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছিলেন রোনালদো। তিনি জানিয়েছিলেন, আসন্ন বছরটি সম্ভবত তার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ বছর হতে পারে।
লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ভোগকে রোনালদো বলেছিলেন, “সম্ভবত এটাই আমার ফুটবলের শেষ বছর এবং আমি একটি দুর্দান্ত উত্তরাধিকার রেখে যেতে চাই।”
দুই দশকেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ৯৭৬ গোল করেছেন রোনালদো। চলতি মৌসুমে সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-নাসরের হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন তিনি। একই সঙ্গে ক্যারিয়ারের এক হাজার গোলের মাইলফলকের আরও কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকবে পর্তুগিজ এই মহাতারকার।