০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৩

ড্রিবলিং থেকে গেম কন্ট্রোল: ছয় বিশ্বকাপে মেসির অবিশ্বাস্য বিবর্তন

ছয় বিশ্বকাপে মেসির বিবর্তন   © টিডিসি ছবি

১৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে নেমেছিলেন বদলি হিসেবে। তখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল গতি, ড্রিবলিং আর ওয়ান-অন-ওয়ানে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার ক্ষমতা। দুই দশক পর ৩৯ বছর বয়সে এসে সেই মেসিই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেন অনেকটা নীরবে—একটি নিখুঁত পাস, সঠিক জায়গায় দাঁড়ানো কিংবা এক সেকেন্ড আগে নেওয়া সিদ্ধান্তে। ছয় বিশ্বকাপের এই দীর্ঘ যাত্রায় বদলেছে মেসির খেলার ধরন, দায়িত্ব ও অবস্থান। বদলায়নি শুধু একটি বিষয়—ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা।

২০০৬ সালের জার্মানি থেকে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা—ছয়টি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ছয়টি প্রজন্মের সঙ্গে খেলেছেন লিওনেল মেসি। সময়ের সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতায় পরিবর্তন এলেও নিজের খেলার ধরন বদলে তিনি বিশ্বসেরাদের কাতারে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।

জার্মানি ২০০৬: ম্যাচ বদলাতে নামা সেই তরুণ

১৮ বছর বয়সে জার্মানি বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। তাকে ঘিরে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। কোচ হোসে পেকেরমান বুঝেছিলেন, তখনই দলের পুরো দায়িত্ব মেসির হাতে তুলে দেওয়ার সময় হয়নি। তবে তিনি জানতেন, তার দলে এমন একজন ফুটবলার আছেন, যিনি যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে পারেন।

সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় মেসির। মাত্র ১৫ মিনিট মাঠে থেকেই বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করেন তিনি। একই ম্যাচে হার্নান ক্রেসপোকে দিয়ে গোলও করান।

এরপর মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেও বদলি হিসেবে মাঠে নামেন মেসি। তবে আইভরি কোস্ট ও জার্মানির বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাননি।

সব মিলিয়ে তিন ম্যাচে ১২২ মিনিট খেলেন মেসি। করেন একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। তখনকার মেসি ছিলেন দুরন্ত গতির এক ফুটবলার। ডান দিক থেকে আক্রমণে উঠে প্রতিপক্ষকে ড্রিবল করে, গতি বাড়িয়ে এবং একের পর এক ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতি তৈরি করে বিপদ সৃষ্টি করতেন তিনি।

তখনও দলের খেলা পরিচালনা করা তার দায়িত্ব ছিল না। তার কাজ ছিল মাঠে নেমে মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়া।

মেসি বনাম মেক্সিকো, ২০০৬ বিশ্বকাপ

দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০: ‘১০ নম্বর’ মেসি

চার বছর পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে মেসি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে মাঠে নামেন। আর্জেন্টিনার কোচ দিয়েগো ম্যারাডোনা তাকে দলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন।

মেসি তখন আর শুধু একজন উইঙ্গার ছিলেন না। মাঠের মাঝামাঝি জায়গায় খেলতেন তিনি। দুই লাইনের মাঝখানে বল নিতেন এবং মাঝমাঠের সঙ্গে কার্লোস তেভেজ ও গঞ্জালো হিগুয়েইনের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতেন।

পাঁচ ম্যাচেই মূল একাদশে ছিলেন মেসি এবং পুরো ৪৫০ মিনিট মাঠে ছিলেন। তবে কোনো গোল করতে পারেননি। আর্জেন্টিনা তার মাধ্যমে অনেক আক্রমণ তৈরি করলেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলটি কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি।

কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।

মেসি তখন ধীরে ধীরে দলের খেলা পরিচালনাকারী ফুটবলার হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যকে এমন একটি দলীয় শক্তিতে রূপ দিতে পারছিলেন না, যা আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।

মেসি বনাম জার্মানি, ২০১০ বিশ্বকাপ

ব্রাজিল ২০১৪: আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নেওয়া মেসি

ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসিকে দেখা যায় আরও পরিণত রূপে। কোচ আলেহান্দ্রো সাবেইয়া তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল তৈরি করেন এবং মেসিকে ডান দিক থেকে মাঝখানে আসার স্বাধীনতা দেন।

আর্জেন্টিনা বল ফিরে পাওয়ার পর আক্রমণের গতি বাড়ানোর দায়িত্ব ছিল মেসির। কোথায় জায়গা তৈরি হচ্ছে এবং কোন দিক দিয়ে আক্রমণ করলে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ফেলা যাবে, সেটিও তিনি দ্রুত বুঝে নিতেন।

গ্রুপ পর্বে চারটি গোল করেন মেসি। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে আনহেল দি মারিয়াকে দিয়ে গোলও করান তিনি।

পুরো টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচ খেলে ৬৯৩ মিনিট মাঠে ছিলেন মেসি। তার পারফরম্যান্সে ভর করে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।

ফাইনালে আবারও জার্মানি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটশে গোল করে জার্মানিকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন। বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ পান মেসি।

কাপটি হাতছাড়া হলেও ওই বিশ্বকাপে মেসির নতুন একটি রূপ দেখা যায়—এমন একজন ফুটবলার, যিনি শুধু নিজে পারফর্ম করেন না, দলকেও বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেন।

মেসি বনাম জার্মানি, ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল

রাশিয়া ২০১৮: একা মেসি যথেষ্ট ছিলেন না

রাশিয়া বিশ্বকাপ ছিল আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিশৃঙ্খল বিশ্বকাপগুলোর একটি। কোচ হোর্হে সাম্পাওলি দলকে স্থির একটি কৌশলে খেলাতে পারেননি। ফলে মেসিকেও বিভিন্ন কৌশল ও ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।

কখনো তিনি ফলস নাইন হিসেবে খেলেছেন, কখনো বল পাওয়ার জন্য অনেকটা নিচে নেমে এসেছেন। আবার অনেক সময় আক্রমণভাগের অন্য খেলোয়াড়দের কাছ থেকেও দূরে অবস্থান করেছেন।

নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করে আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোতে তোলেন মেসি। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে দুটি অ্যাসিস্টও করেন। তবে দিয়েগো দেশমের দল শেষ পর্যন্ত ৪-৩ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেয়।

চার ম্যাচে ৩৬০ মিনিট খেলেন মেসি। তখন তার বয়স ৩১ বছর। শুধু গতি ও দৌড়ের ওপর নির্ভর করে আগের মতো খেলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।

সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়—কৌশল ও বুদ্ধিমত্তাকে আরও বেশি কাজে লাগিয়ে কীভাবে ম্যাচে নিজের আধিপত্য ধরে রাখা যায়।

মেসি বনাম ফ্রান্স, ২০১৮ বিশ্বকাপ

কাতার ২০২২: চূড়ান্ত পরিবর্তন

চার বছর পর সেই প্রশ্নের উত্তর দেন মেসি। ৩৫ বছর বয়সে কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে তিনি নিজের খেলার সবচেয়ে পরিপূর্ণ রূপ খুঁজে পান।

মেসিকে তখন আর পুরো মাঠে সবার পেছনে দৌড়াতে হতো না। প্রতিটি আক্রমণেও তাকে চাপ প্রয়োগ করতে হতো না। কখন গতি বাড়াবেন আর কখন থেমে যাবেন, সেটি নিজেই ঠিক করতেন তিনি।

তিনি হয়ে ওঠেন দলের খেলা পরিচালনাকারী, দ্বিতীয় স্ট্রাইকার, আক্রমণ তৈরির মূল খেলোয়াড়, সেট-পিস বিশেষজ্ঞ এবং মাঠের নেতা।

টুর্নামেন্টে সাত গোল করেন মেসি এবং করান তিনটি গোল। শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল—প্রতিটি নকআউট পর্বেই গোল করেন তিনি।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাহুয়েল মোলিনাকে দেওয়া তার অ্যাসিস্ট ছিল বদলে যাওয়া মেসির অন্যতম সেরা উদাহরণ। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন তিনি। আর ফ্রান্সের বিপক্ষে স্মরণীয় ফাইনালে করেন দুটি গোল।

শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। মেসি অবশেষে নিজের হাতে তুলে নেন সেই ট্রফি, যার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছিলেন।

চ্যাম্পিয়ন মেসি, ২০২২ বিশ্বকাপ

উত্তর আমেরিকা ২০২৬: সময়কে হারানো মেসি

ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মেসির বয়স ছিল ৩৯ বছর। এবার তার দায়িত্ব আরও বেছে বেছে নির্ধারণ করেন স্কালোনি।

ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে এখন আর তাকে বারবার বল স্পর্শ করতে হতো না। ধীরস্থিরভাবে খেলা, একটি নিখুঁত পাস, সেট-পিস কিংবা প্রতিপক্ষের চেয়ে এক সেকেন্ড আগে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত দিয়েও ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারতেন তিনি।

স্কালোনি মেসির এই নতুন রূপকে কাজে লাগান। মেসিও আট ম্যাচে আট গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন তিনি।

বয়স তার গোল করার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেনি—আবারও সেটি প্রমাণ করেন মেসি।

আর্জেন্টিনা আবারও ফাইনালে ওঠে। তবে এবার স্পেন ১-০ গোলে অতিরিক্ত সময়ে জয় পেয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয়।

ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শেষে মেসির বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান দাঁড়ায় ৩৪ ম্যাচ, ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট।

মেসি বনাম ইংল্যান্ড, ২০২৬ বিশ্বকাপ

গতি থেকে গেম কন্ট্রোলে

বিশ্বকাপে মেসির পুরো ক্যারিয়ার বুঝতে একটি পরিবর্তনই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৬ সালে ম্যাচে প্রভাব ফেলতে তার প্রয়োজন ছিল জায়গা, যাতে তিনি দৌড়াতে পারেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে অনেক সময় দেখা গেছে ঠিক উল্টো চিত্র।

কাতার ২০২২ কিংবা উত্তর আমেরিকা ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচ যখন থমকে আছে বলে মনে হয়েছে, তখনই মেসি সবচেয়ে বেশি বিপদ তৈরি করেছেন। তার জন্য জায়গা তৈরি করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন এবং পরের মুহূর্তে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

ছয়টি বিশ্বকাপে মেসি বদলেছেন নিজের অবস্থান, দৌড়ানোর ধরন, দায়িত্ব এবং ম্যাচে প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতি। তবে একটি বিষয় কখনো বদলায়নি—ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা।

প্রথম দিকে পায়ের জাদু ও ড্রিবলিং দিয়ে ম্যাচের ফল বদলাতেন মেসি। এরপর বলের নিয়ন্ত্রণ ও খেলা তৈরির দক্ষতা দিয়ে সেই প্রভাব ধরে রাখেন। আর ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন নিজের ফুটবল বুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

মেসির ছয় বিশ্বকাপ তাই কেবল একটি দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান নয়। এটি ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে ছাপিয়ে যাওয়া এক তরুণের ধীরে ধীরে এমন একজন ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প, যিনি গতি কমিয়েও পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পারেন।