০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৩৯

লিওনেল মেসির উত্তরসূরি কে?

লিওনেল মেসি   © সংগৃহীত

রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়ে যায় একটি ফুটবল ম্যাচের ৯০ মিনিট। কিন্তু কিছু গল্প মাঠের সীমানায় থেমে থাকে না; সময় পেরিয়ে, প্রজন্ম বদলে, সেসব গল্প মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। লিওনেল মেসির গল্পও তেমনই একটি গল্প, যার সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মুহূর্ত জড়িয়ে আছে। তবে ৩১ আগস্ট সেই গল্পের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ লাইন পড়েছে, আর্জেন্টিনার জার্সিতে প্রায় দুই দশকের পথচলার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন মেসি।

মেসির শেষ ম্যাচটি অবশ্য কোনো সাধারণ ম্যাচ ছিল না। সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ হারায় আর্জেন্টিনা; ফেরান তোরেসের গোলেই নির্ধারিত হয় ম্যাচের ফল। এর মধ্য দিয়ে ৩৯ বছর বয়সী মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দাও নেমে যায়! আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোল নিয়ে ইতিহাস হয়েই থাকলেন এই মহাতারকা।

তাই এখন প্রশ্নটা আর মেসি কবে অবসর নেবেন, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, তার পর আর্জেন্টিনার আক্রমণ ও সৃজনশীলতার ভার কারা নেবেন। একজন খেলোয়াড়কে মেসির সরাসরি উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা অবশ্যই আকর্ষণীয়, কিন্তু ফুটবলের বাস্তবতা তার চেয়ে জটিল। মেসি একই সঙ্গে ছিলেন গোলদাতা, সুযোগস্রষ্টা, আক্রমণের মূল কারিগর, সেট-পিস বিশেষজ্ঞ, অধিনায়ক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার খেলোয়াড়। তার বিদায়ের পর সেই দায়িত্বগুলো সম্ভবত একজনের হাতে যাবে না; বরং নতুন আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড়ের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে আকর্ষণীয় নামগুলোর একটি নিকো পাজ। ২০০৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর স্পেনের তেনেরিফে জন্ম নেওয়া পাজ আর্জেন্টিনার সাবেক ডিফেন্ডার পাবলো পাজের ছেলে এবং ছোটবেলা থেকেই দুই দেশের ফুটবল সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। পরে রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমিতে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে উঠে আসেন এবং একসময় মূল দলের দরজায় পৌঁছে যান। শুরুর দিকে রক্ষণভাগে খেললেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝমাঠের আক্রমণাত্মক ভূমিকাতেই নিজের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা খুঁজে পান তিনি।

এই কারণেই মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনাকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ‘পরের মেসি’ খোঁজা নয়, বরং দেখা, কে কোন দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। নিকো পাজ ও ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনোর মধ্যে রয়েছে সৃজনশীলতার সম্ভাবনা, থিয়াগো আলমাদা ইতিমধ্যেই জাতীয় দলের পর্যায়ে সেই দায়িত্বের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, আর হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ গোলের ভার সামলানোর মতো অবস্থানে আছেন। আলেহান্দ্রো গারনাচো কিংবা আরও কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড় যোগ করতে পারেন ভিন্ন ধরনের গতি ও আক্রমণাত্মক বৈচিত্র্য। ফলে মেসির পর আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ হয়তো একজন নতুন তারকার গল্প নয়, বরং একটি প্রজন্মের গল্প।

নিকো পাজের সামনে বড় সুযোগ

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে আকর্ষণীয় নামগুলোর একটি নিকো পাজ। ২০০৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর স্পেনের তেনেরিফে জন্ম নেওয়া পাজ আর্জেন্টিনার সাবেক ডিফেন্ডার পাবলো পাজের ছেলে এবং ছোটবেলা থেকেই দুই দেশের ফুটবল সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। পরে রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমিতে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে উঠে আসেন এবং একসময় মূল দলের দরজায় পৌঁছে যান। শুরুর দিকে রক্ষণভাগে খেললেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝমাঠের আক্রমণাত্মক ভূমিকাতেই নিজের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা খুঁজে পান তিনি।

২০২৩ সালের নভেম্বরে নাপোলির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের মূল দলে অভিষেক হয় পাজের। সেই ম্যাচেই দূরপাল্লার গোল করে নিজের নাম বড় মঞ্চে জানান দেন তিনি, কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের মতো তারকা-সমৃদ্ধ দলে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়া তার জন্য কঠিন ছিল। ২০২৪ সালে তাই ইতালির কোমোতে যোগ দেন পাজ, যেখানে নিয়মিত মাঠে থাকার সুযোগ তার খেলাকে আরও পরিণত করার পথ খুলে দেয়। ২০২৬-২৭ মৌসুমেও কোমোতেই থাকছেন; রিয়াল মাদ্রিদ ভবিষ্যতে তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগও নিজেদের হাতে রেখেছে।

আর্জেন্টিনার জাতীয় দলেও পাজের পথচলা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বলিভিয়ার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই মেসির সঙ্গে বোঝাপড়ায় গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন তিনি, যে মুহূর্তটি তার আন্তর্জাতিক পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে। ২০২৬ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা দলেও ছিলেন পাজ, যদিও পুরো আসরে তার ভূমিকা সীমিত ছিল এবং বড় ম্যাচগুলোতে নিয়মিত মাঠে নামার সুযোগ পাননি। তবু জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তার জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্মে মেসির মতো সৃষ্টিশীল দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

নিকো পাজের পাশাপাশি ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনোকে ঘিরে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা আরও বেশি। ২০০৭ সালের ১৪ আগস্ট আজুলে জন্ম নেওয়া এই বাঁ-পায়ের প্রতিভা রিভার প্লেটের যুব কাঠামো থেকে উঠে এসে খুব অল্প বয়সেই মূল দলে জায়গা করে নেন। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা, বলের নিয়ন্ত্রণ, সৃজনশীল পাস এবং আক্রমণ তৈরির ক্ষমতা তাকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসে। এসব গুণের কারণেই তার সঙ্গে মেসির তুলনা শুরু হয়েছে, যদিও ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে সেই তুলনাকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

পাজের সঙ্গে মেসির তুলনা তাই পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াও কঠিন, বিশেষ করে বাঁ পায়ে বল নিয়ন্ত্রণ, ছোট জায়গায় খেলা এবং শেষ পাস দেওয়ার ক্ষমতার কারণে। কিন্তু তার ওপর ‘নতুন মেসি’ হওয়ার চাপ তৈরি করা হবে ভুল; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কী আর্জেন্টিনার পরবর্তী সৃষ্টিশীল নেতা হয়ে উঠতে পারবেন তিনি? সেই দায়িত্ব মেসির তুলনায় অনেক ছোট মনে হলেও জাতীয় দলের জন্য সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উত্তর। পাজের সামনে এখন সেই সম্ভাবনাকে নিয়মিত পারফরম্যান্সে পরিণত করার চ্যালেঞ্জ।

মাস্তানতুওনোর ক্ষেত্রে সম্ভাবনার সঙ্গে অপেক্ষাও আছে

নিকো পাজের পাশাপাশি ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনোকে ঘিরে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা আরও বেশি। ২০০৭ সালের ১৪ আগস্ট আজুলে জন্ম নেওয়া এই বাঁ-পায়ের প্রতিভা রিভার প্লেটের যুব কাঠামো থেকে উঠে এসে খুব অল্প বয়সেই মূল দলে জায়গা করে নেন। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা, বলের নিয়ন্ত্রণ, সৃজনশীল পাস এবং আক্রমণ তৈরির ক্ষমতা তাকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসে। এসব গুণের কারণেই তার সঙ্গে মেসির তুলনা শুরু হয়েছে, যদিও ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে সেই তুলনাকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

মাস্তানতুওনো ২০২৫ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এবং প্রথম মৌসুমেই ইউরোপের অন্যতম বড় ক্লাবের চাপের সঙ্গে পরিচিত হন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে রিয়ালের হয়ে ৩৫ ম্যাচ খেললেও তার গোল ছিল তিনটি, অর্থাৎ প্রতিভার ঝলক দেখা গেলেও ধারাবাহিক প্রভাব তৈরির জায়গায় এখনও অনেকটা পথ বাকি। ২০২৬-২৭ মৌসুমে নিয়মিত খেলার সুযোগ বাড়াতে তাকে ইতালির ফিওরেন্টিনায় এক মৌসুমের জন্য ধারে পাঠায় রিয়াল মাদ্রিদ।

আর্জেন্টিনার জার্সিতেও তার ওপর প্রত্যাশার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৫ সালে মেসি না থাকায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তাকে দেওয়া হয়েছিল আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি। এত অল্প বয়সে সেই নম্বর পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় প্রতীকী স্বীকৃতি, কিন্তু সেটিকে মেসির উত্তরাধিকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে তুলে দেওয়া হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মাস্তানতুওনোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো যে প্রতিভা তাকে এত দ্রুত আলোচনায় এনেছে, সেটিকে তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে কতটা ধারাবাহিক করতে পারেন।

শুধু কিশোর প্রতিভাদের দিকে তাকালে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার পুরো ছবিটি পাওয়া যাবে না। থিয়াগো আলমাদা এমন একজন খেলোয়াড়, ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন এবং মাঝমাঠের সৃষ্টিশীল দায়িত্ব নেওয়ার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন তিনি। আক্রমণাত্মক মাঝমাঠে খেলা আলমাদার অন্যতম বড় শক্তি হলো বল পায়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া, প্রতিপক্ষের দুই লাইনের মাঝখানে জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং আক্রমণের শেষ ধাপে সতীর্থদের যুক্ত করা। মেসির বিদায়ের পর এই ধরনের খেলোয়াড়ের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

এই কারণেই মাস্তানতুওনোকে নিয়ে অপেক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো আগামী কয়েক বছরে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন, কিন্তু এখনই তাকে সেই জায়গায় বসিয়ে দেওয়া তার বর্তমান অবস্থানকে অতিরঞ্জিত করা হবে। বরং মেসির পর যে প্রজন্মটি আর্জেন্টিনার আক্রমণকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে, মাস্তানতুওনোকে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

থিয়াগো আলমাদা ইতিমধ্যেই সেই দায়িত্বের কাছে

শুধু কিশোর প্রতিভাদের দিকে তাকালে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার পুরো ছবিটি পাওয়া যাবে না। থিয়াগো আলমাদা এমন একজন খেলোয়াড়, ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন এবং মাঝমাঠের সৃষ্টিশীল দায়িত্ব নেওয়ার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন তিনি। আক্রমণাত্মক মাঝমাঠে খেলা আলমাদার অন্যতম বড় শক্তি হলো বল পায়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া, প্রতিপক্ষের দুই লাইনের মাঝখানে জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং আক্রমণের শেষ ধাপে সতীর্থদের যুক্ত করা। মেসির বিদায়ের পর এই ধরনের খেলোয়াড়ের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

আলমাদার গুরুত্ব বোঝার জন্য তার জাতীয় দলের সাম্প্রতিক ভূমিকার দিকে তাকানো যথেষ্ট। ব্রাজিলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বড় জয়ে তার উপস্থিতি এবং বলের ওপর তার আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছে যে দলের আক্রমণ এখন একমাত্র একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না। তিনি মেসির মতো পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেন না, কিন্তু তার খেলায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা আর্জেন্টিনার পরবর্তী সৃজনশীল কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে পাজ ও মাস্তানতুওনোর মতো তরুণদের সঙ্গে তার সমন্বয় তৈরি হলে আর্জেন্টিনার আক্রমণ আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।

২০২৬ বিশ্বকাপেও আলভারেজের গুরুত্ব দেখা গেছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে গোল করেন তিনি এবং নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার আক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তার মতো খেলোয়াড় মেসির সৃষ্টিশীলতার জায়গা পূরণ করবেন না, কিন্তু মেসির অনুপস্থিতিতে দলের গোলের দায়িত্ব অনেক বেশি তার কাঁধে আসতে পারে। আর্জেন্টিনা যদি সৃষ্টিশীলতার ভার পাজ, মাস্তানতুওনো বা আলমাদার মধ্যে ভাগ করে দিতে পারে, তাহলে আলভারেজকে সামনে রেখে সেই আক্রমণের শেষ কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।

এখানে আলমাদার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তিনি আর কেবল সম্ভাবনার নাম নন। জাতীয় দলের জার্সিতে বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা তার আছে এবং মেসির সঙ্গে একই দলে থেকেও তিনি নিজের ভূমিকা তৈরি করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে মেসির অবসরের পর নতুন করে সবকিছু শুরু করার বদলে তাকে আরও বড় দায়িত্ব দেওয়ার পথটি তুলনামূলকভাবে সহজ। তার সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় থেকে জাতীয় দলের নিয়মিত সৃষ্টিশীল কেন্দ্র হয়ে ওঠা।

হুলিয়ান আলভারেজকে নিতে হবে গোলের ভার

মেসির উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শুধু ১০ নম্বর জার্সির উত্তরাধিকার খোঁজা হলে আর্জেন্টিনার প্রয়োজনের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। মেসি যেমন নিজে গোল করতেন, তেমনি সতীর্থদের জন্য সুযোগও তৈরি করতেন; ফলে তার বিদায়ের পর শুধু একজন নতুন সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় নয়, গোল করার ধারাবাহিক উৎসও প্রয়োজন হবে। সেই জায়গায় হুলিয়ান আলভারেজ ইতিমধ্যেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থীদের একজন। মেসির মতো তিনি নন, বরং তার গতি, পরিশ্রম, চাপ তৈরি করার ক্ষমতা এবং গোলের সামনে সঠিক সময়ে পৌঁছানোর দক্ষতা তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় বানিয়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপেও আলভারেজের গুরুত্ব দেখা গেছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে গোল করেন তিনি এবং নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার আক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তার মতো খেলোয়াড় মেসির সৃষ্টিশীলতার জায়গা পূরণ করবেন না, কিন্তু মেসির অনুপস্থিতিতে দলের গোলের দায়িত্ব অনেক বেশি তার কাঁধে আসতে পারে। আর্জেন্টিনা যদি সৃষ্টিশীলতার ভার পাজ, মাস্তানতুওনো বা আলমাদার মধ্যে ভাগ করে দিতে পারে, তাহলে আলভারেজকে সামনে রেখে সেই আক্রমণের শেষ কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।

এখানেই মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট। মেসি থাকাকালে দলের আক্রমণ প্রায়ই তার সিদ্ধান্ত, তার পায়ে বল এবং তার শেষ পাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত; এখন সেটি আরও সমষ্টিনির্ভর হতে পারে। আলভারেজ সেই ব্যবস্থায় একজন প্রধান গোলদাতা, কিন্তু একই সঙ্গে তার নড়াচড়া ও চাপ তৈরির ক্ষমতা অন্যদের জন্যও জায়গা তৈরি করতে পারে। ফলে তার গুরুত্ব কেবল তিনি কত গোল করবেন, সেটিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

গারনাচো যোগ করতে পারেন অন্যরকম গতি

আলেহান্দ্রো গারনাচোকে মেসির উত্তরসূরি বলা আরও বেশি সমস্যাজনক। কারণ, দুজনের খেলার ধরন ও মাঠের ভূমিকা একেবারেই আলাদা। গারনাচো মূলত গতিনির্ভর আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়, প্রান্ত ধরে এগিয়ে যেতে, একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে উঠতে এবং সরাসরি গোলের দিকে যেতে পছন্দ করেন। মেসির মতো পুরো আক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করা তার কাজ নয়, কিন্তু প্রতিপক্ষের রক্ষণকে পিছিয়ে দিতে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার জন্য এমন একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হতে পারে।

আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলে ক্লদিও এচেভেরি, মাতিয়াস সুলে, জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ানি ও জুলিয়ানো সিমিওনের মতো নামও নজরে থাকবে। তবে তাদের এখনই মেসি-পরবর্তী দলের প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয়। কারণ, জাতীয় দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের ভূমিকা এখনও পাজ বা আলমাদার মতো প্রতিষ্ঠিত নয়। তাদের গুরুত্ব বরং এই জায়গায় যে আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্মের তালিকা কয়েকটি পরিচিত নামেই থেমে নেই।

গারনাচোর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই প্রতিভা নিয়ে নয়, ধারাবাহিকতা ও জাতীয় দলে নিজের জায়গা নিয়ে। আর্জেন্টিনার বর্তমান দলে প্রতিটি আক্রমণাত্মক পজিশনের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র, ফলে ক্লাব পর্যায়ে ভালো খেললেই জাতীয় দলে নিয়মিত জায়গা নিশ্চিত হবে না। তবু তার বয়স, গতি এবং একের পর এক খেলোয়াড়কে মোকাবিলা করার ক্ষমতা তাকে পরবর্তী প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিকল্প করে রাখে। মেসির পর আর্জেন্টিনার আক্রমণ যদি আরও বৈচিত্র্যময় হয়, গারনাচোর মতো সরাসরি আক্রমণকারী খেলোয়াড় সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

লাউতারো ও অভিজ্ঞ প্রজন্মও থাকবে

মেসির অবসর মানেই আর্জেন্টিনার পুরোনো প্রজন্মের অবসান নয়। লাউতারো মার্তিনেজের মতো খেলোয়াড়রা এখনও জাতীয় দলের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ এবং মেসি-পরবর্তী সময়ে তাদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে শেষ দিকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন লাউতারো, যা দেখিয়েছিল বড় মুহূর্তে তার প্রভাব এখনও কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই অভিজ্ঞতাই মেসি-পরবর্তী দলের জন্য মূল্যবান হবে। পাজ ও মাস্তানতুওনোর মতো তরুণদের যেখানে সময় ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, সেখানে লাউতারো ও আলভারেজের মতো খেলোয়াড়রা আক্রমণভাগের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারবেন। একইভাবে আলমাদার মতো খেলোয়াড়রা তরুণ সৃষ্টিশীল প্রতিভা ও প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দলের কাঠামোর মধ্যে একটি সেতুর কাজ করতে পারেন। ফলে পরিবর্তনটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হঠাৎ করে চলে যাওয়ার মতো হবে না; বরং কয়েক বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে নেতৃত্ব বদলাবে।

আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলে ক্লদিও এচেভেরি, মাতিয়াস সুলে, জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ানি ও জুলিয়ানো সিমিওনের মতো নামও নজরে থাকবে। তবে তাদের এখনই মেসি-পরবর্তী দলের প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয়। কারণ, জাতীয় দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের ভূমিকা এখনও পাজ বা আলমাদার মতো প্রতিষ্ঠিত নয়। তাদের গুরুত্ব বরং এই জায়গায় যে আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্মের তালিকা কয়েকটি পরিচিত নামেই থেমে নেই।

বরং আর্জেন্টিনার সামনে এখন যে পথটি খোলা, তা হলো দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। নিকো পাজ হতে পারেন সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান মুখ, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো ভবিষ্যতের বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন, থিয়াগো আলমাদা নিতে পারেন মাঝমাঠের আরও বড় দায়িত্ব এবং হুলিয়ান আলভারেজ হতে পারেন গোলের প্রধান ভরসা। গারনাচো যোগ করতে পারেন গতি, আর লাউতারোর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা পরিবর্তনের সময় দলকে স্থিরতা দিতে পারেন।

আরও দূরের ভবিষ্যতে কিকি রামোসের মতো তরুণদের দিকেও নজর থাকবে। হাইতিতে জন্ম নেওয়া রামোস ছোটবেলায় আর্জেন্টিনায় এসে ভেলেস সার্সফিল্ডের যুব কাঠামো থেকে উঠে এসেছেন এবং আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়েও খেলেছেন। তবে তার মতো খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এখনই জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ভবিষ্যদ্বাণী করা ঠিক হবে না; যুব ফুটবলে প্রতিভার সঙ্গে ধারাবাহিক উন্নতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই দীর্ঘ তালিকাটিই আসলে আর্জেন্টিনার জন্য আশাবাদের জায়গা। মেসির মতো একজন খেলোয়াড়ের অবসরের পর স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় শূন্যতা তৈরি হবে, কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণের জন্য দলটির হাতে একাধিক ধরনের খেলোয়াড় আছে। কেউ মেসির সৃষ্টিশীলতার কিছু অংশ নিতে পারবেন, কেউ গোলের দায়িত্ব নেবেন, কেউ প্রান্ত থেকে আক্রমণ করবেন, আবার কেউ মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবেন। ফলে মেসির পর আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করার বদলে একটি দলীয় কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারে।

মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার বহুমুখী প্রভাব। তিনি শুধু গোল করতেন না; আক্রমণ তৈরি করতেন, সতীর্থদের খুঁজে নিতেন, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজেই ফল বদলে দিতেন। সেই কারণে তার উত্তরসূরি হিসেবে একজন খেলোয়াড়কে বেছে নেওয়া যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে ততটাই অসম্ভব।

বরং আর্জেন্টিনার সামনে এখন যে পথটি খোলা, তা হলো দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। নিকো পাজ হতে পারেন সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান মুখ, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো ভবিষ্যতের বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন, থিয়াগো আলমাদা নিতে পারেন মাঝমাঠের আরও বড় দায়িত্ব এবং হুলিয়ান আলভারেজ হতে পারেন গোলের প্রধান ভরসা। গারনাচো যোগ করতে পারেন গতি, আর লাউতারোর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা পরিবর্তনের সময় দলকে স্থিরতা দিতে পারেন।

সেই কারণে মেসির উত্তরসূরি কে, এই প্রশ্নের সবচেয়ে সৎ উত্তর সম্ভবত কোনো একটি নাম নয়। মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা নতুন প্রজন্মের প্রত্যেকেরই আলাদা দায়িত্ব থাকবে এবং তাদের সম্মিলিত পারফরম্যান্সই ঠিক করবে আর্জেন্টিনা পরবর্তী দশকে কতটা সফল হবে। মেসি একটি যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছেন; তার পরের যুগকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে হয়তো একাধিক মুখ।

এই পরিবর্তনের আরেকটি সুবিধা হলো আর্জেন্টিনার বর্তমান দলটি ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে তারা শুধু মেসিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে নেই। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানো দলটি মেসির ওপর নির্ভরশীলতার পুরোনো ধারণাকে অনেকটাই অতিক্রম করেছিল, যদিও তার উপস্থিতি এখনও দলের মান ও প্রতিপক্ষের ওপর প্রভাব ফেলত। মেসির অবসরের পর সেই দলীয় কাঠামোকেই আরও এগিয়ে নিতে হবে, এবার একজন অতিমানবীয় প্রতিভাকে কেন্দ্র করে নয়, বরং একাধিক খেলোয়াড়ের সম্মিলিত শক্তিকে কেন্দ্র করে।

মেসির পরের অধ্যায়

রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলে একসময় আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কিছু জেতার স্বপ্ন দেখেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি কোপা আমেরিকা জিতেছেন, বিশ্বকাপ জিতেছেন, আবার কোপা আমেরিকাও জিতেছেন; ২০২৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতার সুযোগটি ফাইনালে গিয়ে হারালেও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সময় তার উত্তরাধিকার নিয়ে কোনো প্রশ্ন রাখেননি। তার বিদায় তাই কেবল একজন ফুটবলারের অবসর নয়, আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি দীর্ঘ যুগের সমাপ্তি।

কিন্তু প্রতিটি যুগের শেষেই পরের যুগের শুরু থাকে। মেসির পর আর্জেন্টিনার জার্সিতে হয়তো আর এমন একজন খেলোয়াড় দেখা যাবে না; যিনি কিনা একই সঙ্গে গোল করবেন, সতীর্থকে গোল করাবেন, আক্রমণ সাজাবেন এবং প্রতিপক্ষের পুরো পরিকল্পনাকে নিজের উপস্থিতি দিয়ে বদলে দেবেন। তার বদলে হয়তো নিকো পাজের পাস, মাস্তানতুওনোর বাঁ-পা, আলমাদার সৃজনশীলতা, আলভারেজের গোল এবং গারনাচোর গতি মিলে তৈরি হবে নতুন আর্জেন্টিনার পরিচয়।

সেই কারণে মেসির উত্তরসূরি কে, এই প্রশ্নের সবচেয়ে সৎ উত্তর সম্ভবত কোনো একটি নাম নয়। মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা নতুন প্রজন্মের প্রত্যেকেরই আলাদা দায়িত্ব থাকবে এবং তাদের সম্মিলিত পারফরম্যান্সই ঠিক করবে আর্জেন্টিনা পরবর্তী দশকে কতটা সফল হবে। মেসি একটি যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছেন; তার পরের যুগকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে হয়তো একাধিক মুখ।

মেসির গল্প তাই শেষ হলেও আর্জেন্টিনার গল্প শেষ হয়নি। বরং তার বিদায়ের পরই শুরু হচ্ছে এমন এক অধ্যায়, যেখানে নতুন প্রজন্মকে প্রথমবারের মতো নিজেদের পরিচয়ে দলটিকে এগিয়ে নিতে হবে। আর সেই গল্পের প্রথম কয়েকটি নাম এখন বেশ স্পষ্ট—নিকো পাজ, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো, থিয়াগো আলমাদা, হুলিয়ান আলভারেজ, আলেহান্দ্রো গারনাচো এবং তাদের সঙ্গে থাকা এক দল খেলোয়াড়, তারা মেসির উত্তরাধিকার বহন করবে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদের গল্পই লিখবে।