০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩১

যে কারণে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় বললেন মেসি

লিওনেল মেসি   © সংগৃহীত

যে বিদায় কেউ দেখতে চায়নি, অবশেষে সেই বিদায়ের দিনই এলো। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। নিজের হাতে লেখা আবেগঘন এক চিঠিতে বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক জানালেন, সময়ের বাস্তবতা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি এবং নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার ভাবনাই তাঁকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে। তবে বাবাকে হারানোর পর নিজের সিদ্ধান্তে তিনি আরও দৃঢ় হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন এই মহাতারকা।

নিজের হাতে লেখা একটি চিঠির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত আবেগঘন একটি ভিডিওর মাধ্যমে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির একটি গৌরবময় অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল। অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীর কাছে আর্জেন্টিনার হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় তিনি।

মেসি যে জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেটি আগে থেকেই জানা ছিল। তারপরও তাঁর অবসরের খবর আর্জেন্টিনা তো বটেই, পুরো ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, তাঁর বিদায়ের সঙ্গে শেষ হলো এমন একটি অধ্যায়, যেখানে ছিল নানা বাঁক, আবেগ, হতাশা এবং অসাধারণ সাফল্য।

জাতীয় দলে মেসির শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। খুব দ্রুতই তাঁকে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা শুরু হয়। এরপর আসে একের পর এক ফাইনালে হার এবং একপর্যায়ে জাতীয় দল থেকে তাঁর প্রথমবারের মতো দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। পরে সেই হতাশার দিনগুলো পেছনে ফেলে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে একের পর এক সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর সাফল্য এখন পরিসংখ্যানের পাশাপাশি কিংবদন্তির অংশ। কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তিনি আর্জেন্টিনার মানুষের ভালোবাসাও চিরস্থায়ীভাবে অর্জন করেন।

মেসি কেন জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তার সব কারণ অবশ্য শুধু তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠরাই জানেন। তবে নিজের বিদায়ী চিঠিতে তিনি কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন। বিশেষ করে চিঠির শেষ অংশে তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনের একটি গভীর ব্যক্তিগত কারণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

মেসি লিখেছেন, ‘এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর লিখেছিলাম। আজ আমার বাবার চলে যাওয়ার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’

গত ৮ আগস্ট রোজারিওতে মারা যান মেসির বাবা হোর্হে মেসি। তিনি শুধু মেসির বাবা ছিলেন না, ছিলেন তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ, পরামর্শদাতা এবং ছোটবেলা থেকেই তাঁর সবচেয়ে বড় ভক্ত। মেসি বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে পৌঁছানোর অনেক আগ থেকেই হোর্হে তাঁর ছেলের পাশে ছিলেন। রোজারিওর ক্লাব গ্রান্দোলিতে যখন মেসি সবে ফুটবলে নিজের প্রতিভার জানান দিতে শুরু করেছিলেন, তখন থেকেই তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন বাবা।

মেসি তাঁর গোল উদযাপনের সময় যেমন আকাশের দিকে দুই তর্জনী তুলে প্রয়াত নানি সেলিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান, তেমনি পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে তিনি বাবাকেও গর্বিত করতে চেয়েছেন।

সময় যে থেমে থাকে না, সেই বাস্তবতাও ভালোভাবেই বুঝেছেন মেসি। এখন ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তিনি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েছেন। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ তাঁর জন্য অনেক দূরের পথ। এমনকি ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকাও তাঁর সামনে অনেক দূরের বলে মনে হয়েছে।

এমনিতেই সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলবেন কি না, সেটি নিয়ে তাঁকে ভাবতে হয়েছিল। নিজের বিদায়ী চিঠিতে মেসি লিখেছেন, ‘এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা আমার হৃদয়ে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। তবে আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘আর বেশি সময় বাকি নেই। একের পর এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। আর এটি এমন একটি অধ্যায়, যার শেষ আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিশ্বকাপেও মেসি দেখিয়েছেন, বল পায়ে এবং বল ছাড়া—দুইভাবেই তিনি এখনো পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। আট ম্যাচে তিনি করেছেন আট গোল। এর মধ্যে অভিষেক ম্যাচেই করেছিলেন হ্যাটট্রিক। পাশাপাশি তাঁর নামের পাশে রয়েছে চারটি অ্যাসিস্ট।

তারপরও জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামবেন না মেসি। কারণ, আগের মতো নিজের ইচ্ছেমতো পুরো খেলা নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা প্রয়োজনের মুহূর্তে জাদুকরি কিছু করে দলকে উদ্ধার করার মতো অবস্থায় তিনি নিজেকে আর দেখছেন না।

জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে একজন খেলোয়াড়কে নিজের সেরাটা দিতে হয়। মেসি মনে করছেন, সেই অবস্থায় তিনি আর নেই। বিষয়টি শুধু শারীরিক বা ফুটবলীয় সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; মানসিকভাবেও তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

নিজের চিঠিতে মেসি লিখেছেন, ‘আমি নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছি। এখন আর দেওয়ার মতো কিছু আমার কাছে নেই।’

জাতীয় দলকে বিদায় জানাচ্ছেন এমন এক অবস্থায়, যখন তাঁর ঝুলিতে রয়েছে বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং একটি ফাইনালিসিমার শিরোপা। অবশ্য তাঁর অর্জন আরও বড় হতে পারত। কোপা আমেরিকার তিনটি ফাইনালে—২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে—হেরেছেন তিনি। বিশ্বকাপেও ২০১৪ ও ২০২৬ সালে দুটি ফাইনালে পরাজয়ের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর।

তবে মেসির বিদায়ের সময় আর্জেন্টিনা দলে নতুন প্রজন্মও উঠে আসছে। কয়েক বছর আগে যেসব তরুণ ফুটবলার মেসিকে ছোটবেলা থেকে আদর্শ মেনে বড় হয়েছেন, তাদের মধ্যে জুলিয়ান আলভারেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারসহ অনেকেই এখন জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

এবার নতুন প্রজন্মের আরও কয়েকজন প্রতিভাবান ফুটবলার জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছেন। নিকো পাজ ও ভ্যালেন্তিন বারকোর মতো তরুণরা নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

মেসি নিজেও চান, নতুনদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হোক। তাই তাদের পথ আটকে রাখতে চান না তিনি। নিজের বিদায়ী চিঠিতে মেসি লিখেছেন, ‘পেছন থেকে অনেক বড় প্রতিভাবান তরুণ আসছে, যারা জাতীয় দলে থাকার যোগ্য।’

৩৯ বছর বয়সে তাই জাতীয় দলকে বিদায় বললেও মেসি রেখে গেলেন সাফল্যে ভরা এক অনন্য অধ্যায়। বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমা জয়ের পর আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিকে বিদায় জানালেন এমন এক ফুটবলার, যার জায়গা পূরণ করা আগামী দিনে আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে থাকবে।