বিশ্বকাপে বাজিমাত, বড় বড় ক্লাবে উদীয়মান তারকা ফুটবলাররা
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে আলোচনায় এসেছেন বেশ কয়েকজন তরুণ ফুটবলার। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যাঁদের অনেকেই ছিলেন অপরিচিত, তাঁরাই বিশ্বকাপ শেষে নজর কেড়েছেন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর। দারুণ পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে অনেকেই পেয়ে গেছেন বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ যে তরুণ প্রতিভাদের নিজেদের তুলে ধরার বড় সুযোগ, ২০২৬ সালের আসরেও তার প্রমাণ মিলেছে। অনেক উদীয়মান খেলোয়াড় নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়ে বড় ক্লাবের নজরে এসেছেন। তাঁদের কয়েকজন ইতোমধ্যে দলবদল করে পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে।
ইয়ান দিয়োমান্দে—আইভরি কোস্ট
আইভরি কোস্টের ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ইয়ান দিয়োমান্দে ছিলেন বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক। জাতীয় দলের হয়ে দারুণ পারফরম্যান্স করে তিনি দলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে হেরে আইভরি কোস্ট বিদায় নিলেও দিয়োমান্দের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট ছিল ফুটবল বিশ্ব।
লেগানেসে খেলার পর গত মৌসুমে জার্মানির আরবি লাইপজিগে খেলেছেন দিয়োমান্দে। বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের পর এবার তাঁকে দলে টেনেছে রিয়াল মাদ্রিদ।
তাঁকে কিনতে রিয়াল খরচ করেছে ১২৫ মিলিয়ন ইউরো। বিভিন্ন বোনাস যোগ হলে এই অঙ্ক ১৪০ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত উঠতে পারে। এর ফলে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে কেনা খেলোয়াড় হয়েছেন এই তরুণ আইভোরিয়ান।
ইসমাইল সাইবারি—মরক্কো
২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে মরক্কো। ফ্রান্সের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে তাদের যাত্রা শেষ হয়। আশরাফ হাকিমির পাশাপাশি দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন ২৫ বছর বয়সী ইসমাইল সাইবারি।
এই টুর্নামেন্টে মরক্কোর অন্যতম বড় আবিষ্কার হয়ে ওঠেন সাইবারি। মূলত আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হলেও তাঁকে প্রয়োজনে ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলিয়েছে দল।
বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে তিনটি গোল করেন তিনি। তবে চোটের কারণে টুর্নামেন্টের শেষ দিকে আর মাঠে নামতে পারেননি।
সিডনি লোপেস কাবরাল—কেপ ভার্দে
কেপ ভার্দের হয়ে নজর কাড়া খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন সিডনি লোপেস কাবরাল। বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের চমকপ্রদ পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে কেপ ভার্দে বড় চমক দেখায়। উরুগুয়েকে গ্রুপ থেকেই বিদায় করে তারা। এরপর আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় কেপ ভার্দে।
সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজকে ফাঁকি দিয়ে দুর্দান্ত গোল করেন লোপেস কাবরাল। বিশ্বকাপে তাঁর পুরো পারফরম্যান্সই নজর কাড়ে বড় ক্লাবগুলোর।
জার্মানির নিচের সারির ক্লাবের হয়ে খেলার পর পর্তুগালের এস্ত্রেলা দা আমাদোরায় খেলেছেন তিনি। সর্বশেষ বেনফিকায় খুব বেশি খেলার সুযোগ না পেলেও বিশ্বকাপের পর বদলে যায় তাঁর পরিস্থিতি। ৭ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে পর্তুগিজ ফুটবল ছেড়ে নতুন ক্লাবে যোগ দেন তিনি।
আইয়ুব বুয়াদি—মরক্কো
মরক্কোর আরেক তরুণ চমক আইয়ুব বুয়াদি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি।
বুয়াদি আগে ফ্রান্সের যুব দলের হয়ে খেলেছেন। তাঁকে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। তবে শেষ পর্যন্ত মরক্কোর হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেন।
বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় ক্লাব তাঁকে দলে নিতে আগ্রহ দেখায়। এরই মধ্যে লিল ছেড়ে ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার পথে রয়েছেন এই তরুণ মিডফিল্ডার।
নেস্টরি ইরানকুন্ডা—অস্ট্রেলিয়া
তানজানিয়ায় জন্ম নেওয়া নেস্টরি ইরানকুন্ডা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন। শৈশবে তিনি বায়ার্ন মিউনিখের যুব দলে খেলেছেন।
অস্ট্রেলিয়া শেষ ষোলোতে উঠেছিল। সেখানে টাইব্রেকারে মিসরের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় তারা।
২০ বছর বয়সী ইরানকুন্ডা গতি ও শক্তির কারণে উইংয়ে প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছিলেন। বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের পর সুইজারল্যান্ডের গ্রাসহপার ছেড়ে পর্তুগালের স্পোর্টিং লিসবনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান তিনি।
ক্রিস্ট ওউলাই—আইভরি কোস্ট
আইভরি কোস্টের আরেক তরুণ প্রতিভা ক্রিস্ট ওউলাই। দিয়োমান্দের মতো আলোচনায় না এলেও দলের মাঝমাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ২০ বছর বয়সী এই ফুটবলার।
মাঝমাঠের ভেতরের দিকে খেলেন ওউলাই। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ইব্রাহিম সাঙ্গারের বাঁ পাশে থেকে দলকে ভারসাম্য দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন ওউলাই। তাঁকে নিয়ে আগে যে প্রশংসা শোনা গিয়েছিল, মাঠের পারফরম্যান্সে তারই সত্যতা দেখান তিনি।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর দ্রুতই নতুন ঠিকানা খুঁজে নেন ওউলাই। দলবদলের বাজারে তুরস্কের ত্রাবজোনস্পোর ছেড়ে ইতালির ফিওরেন্তিনায় যোগ দেন তিনি। তাঁকে দলে নিতে ফিওরেন্তিনা খরচ করেছে ৩০ মিলিয়ন ইউরো।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু জাতীয় দলের হয়ে নিজেদের প্রমাণ করার মঞ্চ ছিল না, তরুণ ফুটবলারদের ক্যারিয়ার বদলে দেওয়ারও সুযোগ ছিল। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রতিভা দেখিয়ে এই খেলোয়াড়রা এখন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর হয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন।