ফিফার সভাপতি হওয়ার দৌড়ে খেলাইফি-আর্সেন ওয়েঙ্গারসহ ৫ প্রার্থী
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে ঘিরে নতুন করে নেতৃত্ব পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অংশ বিক্রির প্রস্তাব ঘিরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। যদিও তিনি সম্প্রতি বিতর্কিত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, তবু তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ফুটবল অঙ্গনে পাঁচটি নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ইনফান্তিনো আরও এক মেয়াদ দায়িত্বে থাকার সুযোগ পেলেও তার অবস্থান আগের মতো শক্ত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসির মতো শক্তিশালী কনফেডারেশনগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক বিরোধ নেতৃত্বের প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
কেন চাপে ইনফান্তিনো?
বিশ্বকাপ ও ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা একটি কোম্পানি গঠন এবং সেই প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা সামনে আনার পর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েন ইনফান্তিনো।
এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি। এমনকি উয়েফা সতর্ক করে দেয়, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে তাদের সদস্য দেশগুলো ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কটও করতে পারে। শেষ পর্যন্ত তীব্র চাপের মুখে ফিফা প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়ায়।
এদিকে বিতর্কের মধ্যেই ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেছেন। ফলে ফিফার নেতৃত্বে পরিবর্তনের আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
২০২৭ সালের নির্বাচন ঘিরে নতুন হিসাব
ইনফান্তিনো ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ফিফার ২১১ সদস্য দেশের ভোটে ২০২৭ সালে নতুন সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা। এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ প্রার্থী না হলেও কয়েকজন প্রভাবশালী ফুটবল প্রশাসকের নাম আলোচনায় রয়েছে।
আলেকজান্ডার সেফেরিন
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম উয়েফা সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিন।
গত কয়েক বছরে ফিফার একাধিক সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন তিনি। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বিরোধিতায়ও নেতৃত্ব দিয়েছেন সেফেরিন। যদিও তিনি বর্তমানে উয়েফার সভাপতির দায়িত্বে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার সুযোগ রয়েছে।
তবে প্রয়োজন হলে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে নামতে পারেন বলেও ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
নাসের আল-খেলাইফি
প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের সভাপতি এবং ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের (ইসিএ) চেয়ারম্যান নাসের আল-খেলাইফির নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে।
২০২১ সালে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের বিরোধিতার মাধ্যমে তিনি ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।
তবে তার এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, 'ফিফার সভাপতির পদ নিয়ে নাসেরের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা বা আগ্রহ নেই। তিনি বিশ্ব ও ইউরোপীয় ফুটবলের বিভিন্ন সংস্থাকে আগের মতোই সমর্থন দিয়ে যাবেন।'
যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি, পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।
আর্সেন ওয়েঙ্গার
আর্সেনালের কিংবদন্তি সাবেক কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার বর্তমানে ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফুটবলের নিয়ম পরিবর্তন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং খেলাটির উন্নয়ন নিয়ে তিনি নিয়মিত কাজ করছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক ভূমিকার কারণে তাকেও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যদিও এ বিষয়ে ওয়েঙ্গার এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি।
ভিক্টর মন্তাগলিয়ানি
উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফের সভাপতি ভিক্টর মন্তাগলিয়ানিও সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তাকে ভবিষ্যৎ ফিফা সভাপতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ইনফান্তিনোর জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় তার সম্ভাবনা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আগামী বছর কনকাকাফের নির্বাচনও রয়েছে। এরপর তিনি ফিফার সর্বোচ্চ পদে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন।
বাহরাইনের এই ক্রীড়া প্রশাসক বর্তমানে ফিফা কাউন্সিলের সিনিয়র সহ-সভাপতি। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বিরোধিতায় এএফসির অবস্থানও ছিল স্পষ্ট।
ফিফার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে তিনিও সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে?
ফিফা ইতোমধ্যে বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা থেকে সরে এলেও নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা থামেনি। আগামী কয়েক মাসে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
২০২৭ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে। আপাতত আলেকজান্ডার সেফেরিন, নাসের আল-খেলাইফি, আর্সেন ওয়েঙ্গার, ভিক্টর মন্তাগলিয়ানি এবং সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাকেই ইনফান্তিনোর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় দেখা যাচ্ছে।