গণিত ক্লাসে বসেই স্বপ্নপূরণ, বিশ্বাসই হচ্ছিল না রামোসের
অনলাইনে গণিতের ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলেন স্টিফেন ‘কিকি’ রামোস। হঠাৎ একটি বার্তা বদলে দেয় তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ভেলেজ সার্সফিল্ডের ফিটনেস কোচের পাঠানো সেই বার্তা থেকেই জানতে পারেন, আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন তিনি। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। পরে ক্লাস ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে বাবা-মাকে সুখবর জানান। হাইতিতে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ফুটবলার এখন আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম।
রেডিও লা রেদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের নানা অজানা গল্প তুলে ধরেছেন রামোস। সেখানে তিনি আর্জেন্টিনায় বর্ণবাদ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা, জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার মুহূর্ত, ২০১০ সালের হাইতির ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং নিজের শৈশব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
সম্প্রতি ইকুয়েডরের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন রামোস। সেই পারফরম্যান্সের পর থেকেই তাকে নিয়ে ফুটবল মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হাইতিতে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনায় বড় হয়েছেন রামোস। তাই দেশটিতে বর্ণবাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্টভাবেই নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
রামোস বলেন, ‘আমি যখন থেকে আর্জেন্টিনায় আছি, কখনোই নিজেকে বৈষম্যের শিকার মনে হয়নি। কখনোই মনে হয়নি আমি অন্যদের থেকে আলাদা। আর্জেন্টিনা বর্ণবাদী—এমন কথা যারা বলে, তারা না জেনেই বলে। আর্জেন্টিনা একটি দারুণ দেশ।’
সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলে ডাক পাওয়ার মুহূর্তের স্মৃতিও ভাগ করে নেন এই তরুণ উইঙ্গার।
রামোস বলেন, ‘আমি তখন অনলাইনে গণিতের ক্লাস করছিলাম। হঠাৎ ভেলেজের আমার ফিটনেস কোচের একটি বার্তা আসে। সেখানে শুধু লেখা ছিল, ‘‘অভিনন্দন’’। আমি তখন ক্লাসে এতটাই মনোযোগী ছিলাম যে বার্তাটি খুলি না। এরপর বন্ধুদের কাছ থেকেও একের পর এক বার্তা আসতে থাকে। পরে কোচের বার্তাটি খুলে দেখি সেখানে ‘‘এএফএ’’ লেখা। প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি, ভুল পড়েছিলাম। পরে যখন বুঝলাম, তখন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে বাবা-মাকে খবরটা জানাই।’
সাক্ষাৎকারে ২০১০ সালে হাইতিতে হওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথাও স্মরণ করেন রামোস। ওই ভূমিকম্পে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং দেশজুড়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এর আগেই আমার দত্তক নেওয়ার সব কাগজপত্র সম্পন্ন হয়েছিল। ভূমিকম্পের সময় আমি তখনও এতিমখানায় ছিলাম। তবে সৌভাগ্যবশত, আমি সেই শিশুদের একজন ছিলাম, যার কোনো ক্ষতি হয়নি।’
পরে তার বর্তমান বাবা-মা হাইতি থেকে তাকে ছাড়াও আরও তিন শিশুকে নিয়ে আর্জেন্টিনায় আসেন। তখন তারা একে অপরকে চিনতেন না।
শৈশবের নানা স্মৃতি মনে করে রামোস বলেন, বড় হওয়ার পরই তিনি নিজের জীবনের গল্প পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি একটু বড় হওয়ার পর পুরো ঘটনাটা ভালোভাবে বুঝতে পারি। আমার বাবা-মা আমার এবং আমার ভাইবোনদের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি তাদের কাছে সবসময় কৃতজ্ঞ।’
হাইতিতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবেও নিজের অনুভূতির কথা জানান এই তরুণ ফুটবলার।
রামোস বলেন, ‘আমি কখনো হাইতিতে যাইনি। এখন আর্জেন্টিনায় আমার যে জীবন, তাতে আমি ভালো আছি। সত্যি বলতে, কখনো ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবিনি। তবে হয়তো আরও বড় হলে একসময় সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হতে পারে।’
ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোল করে ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন স্টিফেন ‘কিকি’ রামোস। তার পারফরম্যান্স, আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য এবং জীবনের সংগ্রামের গল্প অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিকভাবে এভাবে এগিয়ে যেতে পারলে ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলেও দেখা যেতে পারে এই প্রতিশ্রুতিশীল উইঙ্গারকে।