বিশ্বকাপ ব্যক্তিমালিকানায় ছাড়ার প্রস্তাবে বিভক্ত ফুটবল বিশ্ব
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের গভর্নিং বডি উয়েফার মধ্যকার দ্বন্দ্বে এক নজিরবিহীন উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে উয়েফা এবং এর ৫৫টি সদস্য রাষ্ট্র ফিফার যেকোনো প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার বা বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। উয়েফার পাশাপাশি উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও ফিফার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ইনফান্তিনোর সভাপতির পদ এবং বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
মূলত বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য গঠিত একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। অভিযোগ রয়েছে, নিজ সংস্থার সহকর্মীদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করেই এই অর্থায়ন পরিকল্পনা সামনে আনা হয়, যার পেছনে অন্যতম বিনিয়োগকারী হিসেবে নাম উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিফার সদস্য দেশগুলোকে এই অর্থায়ন পরিকল্পনায় সম্মতি বা অসম্মতি জানাতে বলা হয়েছিল।
উয়েফা স্পষ্ট জানিয়েছে, ফিফার এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তারা বয়কটে যাবে। এর ফলে পোল্যান্ডে আয়োজিত হতে যাওয়া আসন্ন অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ এবং শরৎকালে হতে যাওয়া নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফ ম্যাচগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। উয়েফার সহ-সভাপতি লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ফিফাকে দায়ী করে বলেন, ‘আমাদের এক কোণঠাসা অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর সব দায় ফিফার।’
অন্যদিকে, ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফুটবলের চালিকাশক্তি ইউরোপীয় দলগুলোকে ছাড়া ফিফা কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট বা বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবে না। ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইন মন্তব্য করেন, ‘এই মুহূর্তে ইনফান্তিনোকেই পিছু হটতে হবে। বন্ধুদের নিয়ে করা এই চুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
আগামী বছরের মার্চে ফিফা নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার কথা থাকলেও, বর্তমান সংকটের কারণে তাঁর ওপর আস্থা হারিয়েছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার একাধিক ফুটবল সংস্থা। গুঞ্জন উঠেছে তার বিরুদ্ধে নতুন প্রার্থী দাঁড় করানোর, যেখানে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের (পিএসজি) সভাপতি এবং ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবের শীর্ষ নেতা নাসের আল-খেলাইফির নাম আলোচনায় আসছে—যদিও তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে তিনি এই পদে আগ্রহী নন।
উয়েফার সাবেক প্রধান নির্বাহী লার্স-ক্রিস্টার ওলসন ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এমন পরিস্থিতি বজায় থাকলে ইনফান্তিনোকে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হতে পারে, যা বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
এদিকে উয়েফার দেখানো পথে হেঁটেছে তুলনামুলক কম আলোচনায় থাকা এশিয়ার দেশগুলোর ফুটবল সংস্থা এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (এএফসি)। শুক্রবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, এ বিষয়ে তারা উয়েফা ও কনকাকাফের উদ্বেগের সঙ্গে একমত এবং ফিফার প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে তাদেরও গুরুতর আপত্তি রয়েছে।
বিবৃতিতে এএফসি জানায়, প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রয়োজনীয় ঐকমত্য অর্জন করা কঠিন হবে। সংস্থাটির মতে, বিশ্বকাপের শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা আসে সব কনফেডারেশন ও সদস্য দেশের অংশগ্রহণ থেকে। তাই এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও বিস্তৃত আলোচনা ও পরামর্শ প্রয়োজন ছিল।