বিশ্বকাপজয়ী ইতালির কিংবদন্তি ফুটবলার ফ্রাঙ্কো বারেসি আর নেই
ইতালির বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি ফুটবলার এবং এসি মিলানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধিনায়ক ফ্রাঙ্কো বারেসি আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর শুক্রবার (৩১ জুলাই) ৬৬ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে ইতালি ও বিশ্ব ফুটবলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বারেসির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে তার আজীবনের ক্লাব এসি মিলান। ক্লাবটির আবেগঘন বার্তায় বলা হয়, 'ফ্রাঙ্কো বারেসির প্রয়াণে অশ্রুসিক্ত মিলান। তাঁর আদর্শ ও সততা ক্লাবের ডিএনএতে চিরকাল খোদাই করা থাকবে, ঠিক যেমন অমর হয়ে আছে তাঁর ঐতিহ্যবাহী ৬ নম্বর জার্সিটি।'
মাত্র কয়েক দিন আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারেসির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন এসি মিলান আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে সেই খবরকে মিথ্যা বলে জানায় এবং জানায়, বারেসি কঠিন শারীরিক অবস্থার মধ্য দিয়ে গেলেও তিনি তখন জীবিত ছিলেন। এরপর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত শুক্রবার তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়।
২০২৫ সালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার ফুসফুসে একটি নডিউল ধরা পড়ে। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তিনি ইমিউনোথেরাপিও নিয়েছিলেন। যদিও শুরুতে চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া মিলেছিল, শেষ পর্যন্ত অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানতে হলো ইতালির এই কিংবদন্তিকে।
১৯৬০ সালের ৮ মে ইতালির ত্রাভালিয়াতো শহরে জন্ম নেওয়া বারেসি পুরো খেলোয়াড়ি জীবন কাটিয়েছেন এসি মিলানেই। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত রোসোনেরিদের জার্সিতে ৭১৯টি অফিসিয়াল ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ক্লাবটির অধিনায়ক হিসেবে প্রায় দেড় দশক নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সফল যুগের ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন।
বারেসির নেতৃত্বে এসি মিলান জিতেছিল তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমান উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ), ছয়টি সিরি 'আ' শিরোপা, দুটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ, দুটি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ এবং চারটি ইতালিয়ান সুপার কাপ। ক্লাবের প্রতি অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তার অবসরের পর ৬ নম্বর জার্সিটি স্থায়ীভাবে তুলে রাখে এসি মিলান।
জাতীয় দলের জার্সিতেও সমান উজ্জ্বল ছিলেন বারেসি। ১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইতালির বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি। পরে ১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালিকে তৃতীয় এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। ১৯৯৪ সালের ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে ইতালির হার হলেও বারেসির নেতৃত্ব ও প্রত্যাবর্তনের গল্প আজও ফুটবল ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বারেসি আধুনিক ডিফেন্ডিংয়ের ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন। সুইপার ও সেন্টার-ব্যাক—দুই ভূমিকাতেই তার অসাধারণ পজিশনিং, খেলা পড়ার ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারে পরিণত করেছে। বিশ্বের অনেক কিংবদন্তি ফুটবলার ও কোচ তাকে ইতিহাসের সেরা রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পরও বারেসি এসি মিলানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ক্লাবটির সম্মানসূচক সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং তরুণ ফুটবলারদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছিলেন।
ফ্রাঙ্কো বারেসির মৃত্যুতে শুধু ইতালি নয়, পুরো ফুটবল বিশ্ব হারাল এমন এক কিংবদন্তিকে, যিনি বিশ্বস্ততা, নেতৃত্ব এবং অসাধারণ রক্ষণশৈলীর প্রতীক হয়ে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।