৩১ জুলাই ২০২৬, ১০:০২

ফিফার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ উয়েফা-কনকাকাফ, ৯৬ দেশের বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি

ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো  © সংগৃহীত

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক পুনর্গঠন পরিকল্পনাকে ঘিরে বিশ্ব ফুটবোলে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ও উত্তর, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফ। উয়েফার ৫৫টি ও কনকাকাফের ৪১টি সদস্য ফেডারেশন মিলে মোট ৯৬টি দেশ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। এমনকি পরিকল্পনা প্রত্যাহার না হলে ফিফার অধীনে আয়োজিত প্রতিযোগিতা, যার মধ্যে বিশ্বকাপও রয়েছে, সেগুলো বয়কটের হুমকি দিয়েছে উয়েফা।

পরিকল্পনার বিরুদ্ধে উয়েফার কঠোর অবস্থান

এক বিবৃতিতে উয়েফা জানায়, তাদের ৫৫টি সদস্য ফেডারেশন ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং ইনফান্তিনোর নতুন পরিকল্পনা তারা 'সর্বসম্মত ও দ্ব্যর্থহীনভাবে' প্রত্যাখ্যান করেছে।

বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, 'বিশ্বকাপকে কোনো বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে দেখা যায় না। এটি ফুটবলের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যগুলোর একটি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খেলোয়াড়, জাতীয় দল এবং সমর্থকদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের অবদানে এটি গড়ে উঠেছে। এর কোনো অংশই কখনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।'

উয়েফার দাবি, পুরো পরিকল্পনাটি গোপনে তৈরি করা হয়েছে এবং অর্থবহ কোনো আলোচনা ছাড়াই অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি বলেছে, 'এটি শুধু নেতৃত্বের বড় ব্যর্থতাই নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে ফিফার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর শামিল।'

উয়েফার অভিযোগ, বিশ্বের জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর সামনে কার্যত একটি আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।

তাদের ভাষায়, 'এটি কোনো গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিচালিত এক ধরনের শাসনব্যবস্থা। বিশ্ব ফুটবল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন আচরণ লজ্জাজনক।'

উয়েফার মতে, বাইরের বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হলে ফুটবলের ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে।

সংস্থাটি বলেছে, 'আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার, প্রতিযোগিতার কাঠামো কিংবা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত তখন আর খেলাটির স্বার্থে নেওয়া হবে না; বরং শেয়ারহোল্ডারদের লাভের কথা মাথায় রেখেই নেওয়া হবে।'

এ কারণে উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পরিকল্পনা বহাল থাকলে তারা ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কট করবে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'এই প্রস্তাব বহাল থাকলে উয়েফার কোনো জাতীয় দল ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। কেবল তখনই অংশগ্রহণ করা হবে, যখন এই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করা হবে এবং ফিফা ভবিষ্যতে কখনোই তাদের পরিচালনা বা প্রতিযোগিতাগুলোকে বেসরকারি মালিকানার জন্য উন্মুক্ত করবে না—এমন বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।'

সবশেষে উয়েফা বলেছে, 'কেউ যেন ভুল না বোঝে। উয়েফা এবং আমাদের জাতীয় ফেডারেশনগুলো সর্বোচ্চ দৃঢ়তার সঙ্গে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করবে। এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিচার করা হয় তারা কী গ্রহণ করেছে, তা দিয়ে নয়; বরং কী প্রত্যাখ্যান করেছে, তা দিয়ে। এটি ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত।'

তারা আরও যোগ করে, 'কিছু বিষয় বিক্রির জন্য নয়। ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্পদ। এটি সব সময় ফুটবলেরই থাকবে। ইউরোপের কণ্ঠস্বর যত দিন থাকবে, তত দিন বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।'

ফিফার পরিকল্পনায় কী রয়েছে

ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফা 'ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' (এফএফই) নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছে। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং ফিফার অন্যান্য প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করছে ফিফা। তবে তারা সংখ্যালঘু অংশীদার থাকবে এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পাবে না।

ফিফার দাবি, নতুন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত সব নিট মুনাফা বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্নয়নে পুনঃবিনিয়োগ করা হবে। একই সঙ্গে ২১১টি সদস্য ফেডারেশনের আর্থিক সহায়তাও বাড়ানো হবে।

একই অবস্থান নিয়েছে কনকাকাফ

উয়েফার পর একই অবস্থান নিয়েছে কনকাকাফও। জরুরি বৈঠকে সংস্থাটির ৪১টি সদস্য ফেডারেশন সর্বসম্মতিক্রমে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।

কনকাকাফের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'কনকাকাফ এবং এর ৪১টি সদস্য ফেডারেশন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, ফুটবলের ভবিষ্যৎ এবং এর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অবশ্যই ফুটবল পরিবারের হাতেই থাকতে হবে।'

বৈঠকে সদস্যরা ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করবে। প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ২ হাজার কোটি ডলার।

ফিফা আবারও জানিয়েছে, বিশ্বকাপ বা এর পরিচালনা বিক্রি করা হচ্ছে না। এফএফই থেকে পাওয়া অর্থ বর্তমান 'ফিফা ফরওয়ার্ড' কর্মসূচির মাধ্যমে সদস্য ফেডারেশনগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হবে। ২০২৩-২০২৬ চক্রে প্রতিটি ফেডারেশন ৮০ লাখ ডলার পেলেও ২০২৭-২০৩০ চক্রে সেই অর্থ বাড়িয়ে ২ কোটি ডলার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে কনকাকাফ এই প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সংস্থাটি বলেছে, 'এই পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফিফার পরিচালনা পর্ষদের যথাযথ পর্যালোচনা বা অনুমোদনও নেওয়া হয়নি।'

কনকাকাফ আরও প্রশ্ন তুলেছে, ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক বিশ্বকাপ আয়োজনের পরও নতুন করে কেন বেসরকারি মূলধনের প্রয়োজন হবে।

সবশেষে সংস্থাটি ফিফার কাছে আরও বেশি স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান আর্থিক রিজার্ভ ব্যবহার করে আঞ্চলিক ফুটবল উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগেরও দাবি জানিয়েছে।

উয়েফার পর কনকাকাফও এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ইনফান্তিনোর বাণিজ্যিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা এখন বিশ্ব ফুটবলে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দুই কনফেডারেশনের মোট ৯৬টি সদস্য দেশের এই বিরোধিতায় ফিফার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।