স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনালের আগে যা জানা জরুরি
প্রায় ৩৯ দিনের বিশ্বকাপ যাত্রার শেষ অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে রবিবার। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
এদিকে এবারের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ ও সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষণভাগ। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৯ গোল করেছে আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন। পাশাপাশি ৬০ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের বর্তমান দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন।
দুই প্রজন্মের দুই তারকার লড়াইয়ে ফাইনালটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে। একদিকে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ছোটবেলা থেকেই মেসিকে নিজের আদর্শ হিসেবে দেখে বড় হয়ে উঠা ১৯ বছরের স্প্যানিশ বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল।
বিশ্বকাপ ফাইনাল কোথায় অনুষ্ঠিত হবে?
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এই স্টেডিয়ামটি এনএফএলের দুই দল নিউইয়র্ক জায়ান্টস এবং নিউইয়র্ক জেটসের ঘরের মাঠ হিসেবে পরিচিত। তবে বিশ্বকাপের জন্য সাময়িকভাবে স্টেডিয়ামটির নাম পরিবর্তন করে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম রাখা হয়েছে।
২০১০ সালে নির্মিত এই বিশাল বহুমুখী স্টেডিয়ামে ফুটবল ম্যাচে প্রায় ৮২ হাজার ৫০০ দর্শক উপস্থিত থাকতে পারেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে এই ভেন্যু ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং দুটি সেমিফাইনালও আয়োজন করেছে।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচের মঞ্চ হিসেবে মেটলাইফ স্টেডিয়াম এবার শিরোপার লড়াইয়ে নামা দুই পরাশক্তি স্পেন ও আর্জেন্টিনাকে স্বাগত জানাবে।
সুপারকম্পিউটারের চোখে এগিয়ে স্পেন
অপ্টার সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনায় এগিয়ে রয়েছে স্পেন। তাদের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ৫৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ, আর ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার সম্ভাবনা ৪০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান
এ পর্যন্ত ১৬ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। স্পেন ও আর্জেন্টিনা—উভয়েরই জয় ৬টি করে, ড্র হয়েছে ২টি ম্যাচ। এর মধ্যে বিশ্বকাপে দুই দলের একমাত্র দেখা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের আসরে। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
সবশেষ পাঁচ দেখায় ফলাফল
২০১৮: স্পেন ৬-১ আর্জেন্টিনা
২০১০: আর্জেন্টিনা ৪-১ স্পেন
২০০৯: স্পেন ২-১ আর্জেন্টিনা
২০০৬: স্পেন ২-১ আর্জেন্টিনা
১৯৯৯: আর্জেন্টিনা ২-০ স্পেন
ইতিহাস ও অর্জন
স্পেন একবার (২০১০) বিশ্বকাপ জিতেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা তিনবার (১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২) শিরোপা ঘরে তুলেছে।
মহাদেশীয় আসরেও দুই দলই নিজেদের অঞ্চলের সবচেয়ে সফল। স্পেন চারবার ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, আর আর্জেন্টিনা রেকর্ড ১৬ বার কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতেছে।
নজরে যারা
স্পেনের হয়ে এবার সবচেয়ে বেশি পাঁচ গোল করেছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। মাঝমাঠে রদ্রি ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা, টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৬৪৮টি সফল পাস দিয়েছেন তিনি। ইনজুরি কাটিয়ে খেলা লামিন ইয়ামাল এখনো নিজের সেরা ছন্দে না ফিরলেও ডান প্রান্তে প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি।
আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে আছেন লিওনেল মেসি। ৮ গোল ও চার অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুট জয়েরও অন্যতম দাবিদার তিনি। পাশাপাশি লাউতারো মার্তিনেজ (৩ গোল) ও এনজো ফার্নান্দেজ (২ গোল) আর্জেন্টিনার আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
কোচ ও খেলোয়াড়দের প্রত্যাশা
স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বিশ্বাস করেন, দুই দলই আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক ফুটবল উপহার দেবে। তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, স্পেন ও আর্জেন্টিনা—দুই দলই এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে, যেখানে প্রতিভা ও ভালো ফুটবল সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকবে।”
যদিও অধিনায়ক রদ্রি বলছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠা তাদের যাত্রার বড় অর্জন হলেও লক্ষ্য এখন শিরোপা জয়। দলের বর্তমান প্রজন্মের সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই দল ও এই প্রজন্ম নিজেদের একটি পরিচয় তৈরি করবে—এটা আমরা জানতাম। এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের যাত্রা নিয়ে আমরা আনন্দিত, তবে এখানেই থেমে যেতে চাই না; আমাদের লক্ষ্য আরও বড়।”
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি লিওনেল মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, “এটা আমাকে গর্বিত করে। কারণ, মেসি ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। ৩৯ বছর বয়সে যেভাবে সে এই মুহূর্তে এসে বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজও এই মুহূর্ত উপভোগ করার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সত্যি বলতে, আমরা যা অর্জন করেছি তা ভাবলে মাঝে মাঝে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। আমি শুধু এই মুহূর্তটা উপভোগ করতে চাই। কারণ ফুটবলার হিসেবে অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না, ক্যারিয়ারের কোথায় অবস্থান করছি। সতীর্থদের আমার বার্তা—এই মুহূর্ত উপভোগ করো, হাসিমুখে প্রস্তুতি নাও। কারণ এটি এমন কিছু, যা আমরা সারাজীবন মনে রাখব।”
ড্র হলে কী হবে?
নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ম্যাচ ড্র থাকলে ১৫ মিনিট করে দুই অর্ধে অতিরিক্ত সময় অনুষ্ঠিত হবে। এরপরও সমতা থাকলে টাইব্রেকারে নির্ধারিত হবে এবারের ফিফা বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন।