১৬ জুলাই ২০২৬, ১০:২৫

আর্জেন্টিনার কাছে যেখানে হারল ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ড ফুটবল দল   © টিডিসি ফটো

২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হেরে আবারও বড় টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হলো ইংল্যান্ড। এই হার শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি সমস্যাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। ১৯৬৬ সালে একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর ৬২ বছর পেরিয়ে গেলেও ইংল্যান্ড এখনো আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে পারেনি।

প্রতিবারের মতো এবারও বড় মঞ্চে ভালো শুরু করেও শেষ মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে ইংল্যান্ড। যেন একই গল্প বারবার ফিরে আসছে। বড় ম্যাচে এগিয়ে থেকেও জয় ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতা এখন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।

বিশ্বকাপে থমাস টুখেলকে শুরুতে অসাধারণ কোচ বলেই মনে হচ্ছিল। গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে কৌশল বদলে দলকে জিতিয়েছেন। শেষ ৩২-এ কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও পরিবর্তনের মাধ্যমে দলকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছেন। মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষেও রক্ষণে পাঁচজন খেলিয়ে জয় ধরে রেখেছিলেন।

কিন্তু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেই একই কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দেয়। ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর টুখেল একের পর এক রক্ষণাত্মক পরিবর্তন আনেন। এতে দল ধীরে ধীরে খেলার নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফিরে আসে।

ম্যাচ শেষে সমালোচনার জবাবে টুখেল বলেন, 'হারলেই সমালোচনা হবে। এটাই স্বাভাবিক। আমরা অন্য সিদ্ধান্ত নিলে কী হতো, সেটা কেউ জানে না।'

তার কথা ঠিক হলেও, ইংল্যান্ড তাকে দায়িত্ব দিয়েছিল ভিন্ন কিছু করার জন্য। কিন্তু আটলান্টার সেমিফাইনালে অনেকের কাছেই মনে হয়েছে, টুখেল ও সাবেক কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যায়নি।

সাউথগেটের সময়ও ইংল্যান্ড বড় ম্যাচে এগিয়ে থেকেও জয় ধরে রাখতে পারেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও হেরে যায় তারা। আবার ২০২০ ইউরোর ফাইনালে ইতালির বিপক্ষেও প্রথমে এগিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে শিরোপা হারায়।

এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে এগিয়ে থেকে জয় ধরে রাখতে পেরেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী আক্রমণভাগের দলের বিপক্ষে এত দীর্ঘ সময় শুধু রক্ষণ সামলানোর চেষ্টা করা বড় ভুল হয়ে যায়।

ম্যাচের প্রথম ৫৫ মিনিট ইংল্যান্ড পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেছিল। জুড বেলিংহ্যাম, অ্যান্থনি গর্ডন ও জেড স্পেন্সের গতি আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে ফেলেছিল। গর্ডনের গোলে এগিয়েও যায় তারা।

কিন্তু এরপর ইংল্যান্ড নিজেদের রক্ষণে গুটিয়ে যায়। সেই সুযোগই কাজে লাগান ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। নিজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় তিনি ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে দেন।

ইংল্যান্ডের আরেকটি পুরোনো সমস্যা হলো, তারা বড় দলের বিপক্ষে খুব কমই জিততে পারে। ১৯৯৮ সালের পর অনুষ্ঠিত আটটি বিশ্বকাপের মধ্যে সাতবারই তারা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে বিদায় নিয়েছে।

একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি জয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ক্রোয়েশিয়ার কাছেই তারা বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হেরে যায়।

বহু বছর ধরেই ইংল্যান্ডের মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি রয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে আন্দ্রেয়া পিরলো, ২০২১ ইউরোতে জর্জিনিও ও মার্কো ভেরাত্তি এবং ২০২৪ ইউরো ফাইনালে মার্টিন সুবিমেন্দি মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে ইংল্যান্ডকে বিপদে ফেলেছিলেন।

সাউথগেটের অধীনে ইংল্যান্ড আরও কারিগরি ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শিরোপা জেতা দলগুলোর মতো ধারাবাহিকতা ও ছন্দ তারা কখনোই গড়ে তুলতে পারেনি।

এই ব্যর্থতার আরেকটি কারণ ক্লান্তি। ইংল্যান্ডের অনেক ফুটবলার সারা মৌসুম প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ইউরোপা লিগে প্রচুর ম্যাচ খেলেছেন। হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম বিদেশে খেললেও দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড় ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে দীর্ঘ মৌসুম কাটিয়ে বিশ্বকাপে এসেছেন।

এর পাশাপাশি সেমিফাইনালে ওঠা চার দলের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত সূচি ছিল ইংল্যান্ডের। তারা নিজেদের বেস ক্যাম্পও এমন জায়গায় করেছিল, যেখান থেকে প্রতিটি ম্যাচে দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হয়েছে।

টুখেলও ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন, মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচের পর তার খেলোয়াড়রা ক্লান্ত ছিল।

তবে শুধু ক্লান্তিই নয়, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রক্ষণাত্মক সিদ্ধান্তও তাদের ক্ষতি করেছে। টুখেল পাঁচ ডিফেন্ডারের কৌশলে ফিরে যান। এতে পাল্টা আক্রমণের গতি নষ্ট হয়ে যায় এবং হ্যারি কেইন সামনে একা হয়ে পড়েন।

ইংল্যান্ডের সমস্যার আরেকটি দিক হলো মানসিকতা। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি দলের মানসিক শক্তির ব্যাখ্যা দেন।

তিনি বলেন, 'রক্তের গন্ধ পেয়েছিলাম, তাই আমরা আক্রমণে গিয়েছিলাম।'

কীভাবে তা সম্ভব হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে স্কালোনি বলেন, 'আমার খেলোয়াড়রা সাত-আট বছরের শিশুর মতো খেলেছে। তারা ভুল হলে কী হবে, সেটা ভাবেনি। জয়, ড্র বা হার—এসব নিয়ে তারা খেলেনি। তারা শুধু নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেছে।'

প্রশ্ন উঠছে, ইংল্যান্ড কি একই কথা বলতে পারে?

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আগে গোল করে শেষ পর্যন্ত হারার ঘটনা ঘটেছে মাত্র দুবার। দুটি ঘটনাই ইংল্যান্ডের।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর থেকে লাউতারো মার্তিনেজের যোগ করা সময়ের জয়সূচক গোল পর্যন্ত ৩৭ মিনিটে ইংল্যান্ডের বল দখলের হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। এত কম সময় বলের নিয়ন্ত্রণ রেখে বড় দলকে হারানো প্রায় অসম্ভব।

টুখেল অবশ্য এই ব্যর্থতাকে কোনো অভিশাপ বা ইংল্যান্ডের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখতে চান না।

তিনি বলেন, 'আমি ইংল্যান্ডের কোনো অভিশাপ বা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে বিশ্বাস করি না। এখানে ভিন্ন কোচ, ভিন্ন খেলোয়াড়, ভিন্ন প্রতিপক্ষ এবং ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। আমার মতে, আজ আমরা ফুটবলীয় কারণেই হেরেছি। আমরা যথেষ্ট সক্রিয় ছিলাম না।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা আর ব্যক্তিগত লড়াইয়ে জিততে পারিনি। প্রতিপক্ষের ওপর চাপও ধরে রাখতে পারিনি। বলের কাছেও যেতে পারিনি।'

ইংল্যান্ডের সাবেক কোচ স্ভেন-গোরান এরিকসন একসময় বড় টুর্নামেন্টে দলের পারফরম্যান্স ব্যাখ্যা করতে একটি কথা প্রায়ই বলতেন, 'প্রথমার্ধ ভালো, দ্বিতীয়ার্ধ ততটা ভালো নয়।'

ফাবিও ক্যাপেলোও এই সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। এরপর আসা কোনো কোচই পারেননি।

মজার বিষয় হলো, ইউরো ২০২৪-এর সময় গ্যারেথ সাউথগেটের ইংল্যান্ডকে নিয়ে টুখেল নিজেই একবার বলেছিলেন, 'দলের পরিচয়, স্পষ্ট পরিকল্পনা, ছন্দ, নির্দিষ্ট কৌশলের পুনরাবৃত্তি, খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং জয়ের ক্ষুধা—এসবের অভাব ছিল। আমার মনে হয়েছে, তারা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় হওয়ার ভয় বেশি পেয়েছে, জেতার ক্ষুধা কম ছিল।'

সময়ের ব্যবধানে সেই কথাগুলো যেন আজ তার নিজের দলের ক্ষেত্রেও সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বড় টুর্নামেন্টে বারবার একইভাবে হারার যে মানসিক ক্ষত, সেটিই এখন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। ২০২৮ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের আগে সেই মানসিক বাধা ভাঙাই হবে থমাস টুখেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।