১৪ জুলাই ২০২৬, ১৩:৩৭

লামিন ইয়ামাল জ্বলে উঠবেন নাকি ফের এমবাপ্পের মাস্টারক্লাস

লামিন ইয়ামাল ও এমবাপ্পে   © টিডিসি ফটো

বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মঙ্গলবার ডালাসে মুখোমুখি হবে স্পেন ও ফ্রান্স। দুই ইউরোপীয় পরাশক্তির এই লড়াই ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনার শেষ নেই। তবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন দুই প্রজন্মের দুই তারকা—কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিন ইয়ামাল। প্রশ্ন একটাই, এই ম্যাচে জ্বলে উঠবেন ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল, নাকি আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের মাস্টারক্লাস দেখাবেন এমবাপ্পে?

২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। অন্যদিকে ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন চাইছে এমন এক কীর্তি গড়তে, যা এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি দেশ করতে পেরেছে। বিশ্বকাপ ও ইউরোর শিরোপা একসঙ্গে ধরে রাখার পথে আর মাত্র দুটি জয় দূরে রয়েছে স্প্যানিশরা।

দুই দলেই তারকার ছড়াছড়ি। তবু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এমবাপ্পে ও ইয়ামাল।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপেই বিশ্ব ফুটবলে নিজের আগমনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এমবাপ্পে। শেষ ষোলোতে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে জয়ের পথ দেখান তিনি। সেই ম্যাচকে অনেকেই ফুটবল বিশ্বের প্রজন্ম বদলের সূচনা হিসেবে দেখেন।

আট বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এবার আরেক তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের সামনে একই ধরনের সুযোগ। এখন পর্যন্ত খুব বেশি আলো ছড়াতে না পারলেও সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য দেখানোর অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

বর্তমানে এমবাপ্পেকে বিশ্বের সেরা ফুটবলার বললে খুব বেশি আপত্তি ওঠার সুযোগ নেই। গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করে তিনি লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—দুই প্রতিযোগিতারই সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।

বিশ্বকাপেও দারুণ ছন্দে রয়েছেন ফরাসি অধিনায়ক। ছয় ম্যাচে আট গোল করে লিওনেল মেসির সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন তিনি। পাশাপাশি ১১টি গোলে সরাসরি অবদান রেখে এই টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোল অবদানও তার।

বিশ্বকাপে এমবাপ্পের মোট গোল এখন ১৯টি। সামনে আছেন শুধু মেসি, যার গোল সংখ্যা ২০। মেসি না থাকলে মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে এমবাপ্পেই হতেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

তবে এত সাফল্যের মাঝেও একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত খেললেও এখনো বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেননি তিনি।

বিশ্বকাপ ফাইনালেও এমবাপ্পের পারফরম্যান্স ঈর্ষণীয়। প্রথম ফাইনালে গোল করেছিলেন, দ্বিতীয় ফাইনালে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। কিন্তু দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতা হয়নি।

চলতি গ্রীষ্মে অলিভিয়ে জিরুকে ছাড়িয়ে ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন এমবাপ্পে। ১০৪ ম্যাচে তার গোল এখন ৬৪টি।

এমবাপ্পের উত্থান নিয়ে জিরু বলেন, ‘আমার কাছে এটা স্রেফ ওর উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর আত্মবিশ্বাস। ও ভালো করেই জানে ও কোথায় পৌঁছাতে চায়। ও একজন নেতা এবং খুব ছোটবেলা থেকেই বোঝা যেত ও মাঠের মধ্যে কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বয়সের তুলনায় ও অনেক বেশি পরিপক্ক।’

ফরাসি ফুটবল সাংবাদিক লুক এন্টউইসলও এমবাপ্পের প্রশংসা করে বলেন, ‘ও টানা তিনটি বিশ্বকাপে এই দলটিকে টেনে নিয়ে গেছে, যেখানে ওই ছিল দলের মূল চালিকাশক্তি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ও দুর্দান্ত পরিসংখ্যান গড়েছে ঠিকই, কিন্তু ফ্রান্স ও দেশের বাইরে মানুষের ধারণা ছিল যে ও দলের যৌথ প্রচেষ্টার ক্ষতি করছে। লোকে বলছিল ওর বল ছাড়া আরও বেশি দৌড়ানো উচিত, রক্ষণভাগকে সাহায্য করা উচিত। ও ঠিক সেটাই কাজে করে দেখিয়েছে। এই টুর্নামেন্টে ফ্রান্স যেভাবে প্রতিপক্ষের সীমানায় গিয়ে বল কেড়ে নিচ্ছে, এমবাপ্পে সাহায্য না করলে তা সম্ভব হতো না।’

ফরাসি ফুটবল বিশেষজ্ঞ জুলিয়েন লরেন্স মনে করেন, এমবাপ্পে একদিন জিনেদিন জিদান ও মিশেল প্লাতিনিকেও ছাড়িয়ে যাবেন।

তিনি বলেন, ‘আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে ক্যারিয়ারের শেষে ওই হবে ফ্রান্সের এক নম্বর খেলোয়াড়। এই বিশ্বকাপের পরও ওর সামনে আরও অন্তত একটি বিশ্বকাপ এবং ইউরো খেলার সুযোগ থাকবে। তাই ও সম্ভবত আমাদের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হতে যাচ্ছে।’

অন্যদিকে গত সোমবার ১৯ বছরে পা দিয়েছেন লামিন ইয়ামাল। কিন্তু এত অল্প বয়সেই তাকে বিশ্বের সেরা তরুণ ফরোয়ার্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বার্সেলোনার হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে ইউরো ২০২৪-এ স্পেনকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্যালন ডি'অরের রানার্সআপও হন।

তবে এপ্রিলের হ্যামস্ট্রিং চোট তার বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে পাঁচ ম্যাচে মাত্র একটি গোল করেছেন তিনি।

স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘আমি ওকে শান্ত থাকতে বলেছি। ও গত বছরই প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে। এখন ওর বয়স ১৯। ভাবুন তো, আমি ওকে স্রেফ শান্ত থাকতে, খেলাটা উপভোগ করতে এবং সব দুশ্চিন্তা ভুলে যেতে বলেছি। ওর উচিত ফুটবলটা উপভোগ করা। এই বিশ্বকাপে লামিনের আসল বড় দিনটি এখনও আসা বাকি।’

স্পেনের খেলার ধরনও কিছুটা বদলাতে হয়েছে। লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস পুরোপুরি ফিট না থাকায় আগের মতো উইংভিত্তিক আক্রমণের বদলে এখন ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।

স্প্যানিশ ফুটবল সাংবাদিক রুরিধ বার্লো বলেন, ‘এর মানে হলো লামিন ইয়ামাল এখন মাঠে খেলার জন্য কম জায়গা পাচ্ছেন, ডিফেন্ডাররা তাকে দুদিক থেকে ঘিরে ধরছে এবং স্পেনের খেলায় গতিশীলতা কিছুটা কমে গেছে। তাই ও যে খুব একটা চোখধাঁধানো খেলা দেখাতে পারছে না, সেটা যৌক্তিক। দে লা ফুয়েন্তে এবং স্পেনের এখন ওর কাছ থেকে যা প্রয়োজন—তা হলো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ও নিটোল রক্ষণ ধরে রেখে প্রতি ম্যাচে দুই বা তিনটি এমন মুহূর্ত তৈরি করা, যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ভেঙে দেয় বা এলোমেলো করে দেয়। এখন পর্যন্ত ও কমবেশি সেটা করে দেখিয়েছে।’

দে লা ফুয়েন্তে নিজেও বলেন, ‘এটাই ওর আসল সময়। ১০টি গোল করার সময় নয়, বরং বড় ম্যাচে জয়সূচক ভূমিকা রাখার সময়।’

বার্সেলোনায় ইয়ামালের অভিষেক করানো জাভিও তার প্রশংসা করেছেন।

তিনি লেখেন, ‘আমরা মাঝে মাঝে ওর বয়স ভুলে যাই এবং হয়তো ওর কাছে একটু বেশিই দাবি করে বসি, কিন্তু ও এতটাই প্রতিভাবান যে সব সামলাতে পারে। মাঠে এত রকম কাজ করার ক্ষমতা ওর আছে যে দলে ওর প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। সতীর্থরা ওকে মাঠে বেশি খোঁজে। ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে যখনই সমস্যা তৈরি হয়, বল লামিনের কাছেই যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ও মাঠের এমন একজন নেতা, যে এত কম বয়সেই পার্থক্য গড়ে দেয়—যা আমরা আগে কেবল লিওনেল মেসি, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, পেলে এবং হয়তো রোনালদো নাজারিওর মধ্যেই দেখেছি। লামিন যদি চায়, তবে আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর ওরই থাকবে।’

পরিসংখ্যান অবশ্য এমবাপ্পেকেই এগিয়ে রাখছে। ৩০টি শট থেকে আট গোল করেছেন তিনি। অন্যদিকে ইয়ামাল ২৩টি শট থেকে করেছেন মাত্র একটি গোল।

এমবাপ্পে তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন, ইয়ামাল এখনো কোনো অ্যাসিস্ট করতে পারেননি। তবে এক্সপেক্টেড অ্যাসিস্ট (xA)-এ এগিয়ে আছেন স্প্যানিশ তরুণ, যা প্রমাণ করে তিনি সতীর্থদের জন্য ভালো সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলো গোলে পরিণত হয়নি।

ড্রিবলিং ও রক্ষণে অবশ্য ইয়ামাল এগিয়ে। তিনি এমবাপ্পের দ্বিগুণ সফল ড্রিবল করেছেন। এমবাপ্পে যেখানে মাত্র একটি ট্যাকল করেছেন, সেখানে ইয়ামাল করেছেন আটটি।

বিশ্বকাপে স্পেন ও ফ্রান্স এর আগে মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছিল। ২০০৬ সালের শেষ ষোলোর সেই ম্যাচে ৩-১ গোলে জিতেছিল ফ্রান্স।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের লড়াইয়ে এগিয়ে স্পেন। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে ইয়ামালের অসাধারণ গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল স্প্যানিশরা। এরপর উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালেও ৫-৪ গোলের রোমাঞ্চকর জয় পায় তারা।

এমবাপ্পের বিপক্ষে আগের ১০ ম্যাচের মধ্যে আটটিতেই জয় পেয়েছেন ইয়ামাল। যদিও সেই ১০ ম্যাচে এমবাপ্পে করেছেন ৯ গোল, আর ইয়ামালের গোল ছয়টি।

তাই ডালাসের এই সেমিফাইনাল শুধু দুই দলের লড়াই নয়, দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকারও বড় পরীক্ষা। এই দ্বৈরথে যিনি জিতবেন, তিনিই ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে ফাইনালে উঠবেন।