ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে সুখবর পেল আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের আগে স্বস্তির খবর পেল আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের মঞ্চে নামার আগে দলের আক্রমণভাগ আবারও ছন্দে ফিরেছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জুলিয়ান আলভারেজের গোল, লাওতারো মার্তিনেসের কার্যকর ভূমিকা এবং লিওনেল মেসির ওপর আগের তুলনায় কম নির্ভরতা—সব মিলিয়ে নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার আক্রমণকে তিনটি ভিন্ন পর্যায়ে দেখা গেছে। ম্যাচের শুরুতে আক্রমণে বেশ ধারালো ছিল লিওনেল স্কালোনির দল। সেই সময়ে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ছিলেন বেশ সক্রিয়। তিনি একটি শট নেওয়ার পাশাপাশি দুটি হেড করেন, যার দ্বিতীয়টি থেকেই গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন।
তবে গোলের পর আর্জেন্টিনার খেলার ধরনে পরিবর্তন আসে। দল নিজেদের অর্ধে অনেক বেশি পিছিয়ে যায় এবং দ্বিতীয় বল দখলের লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করতে থাকে। এই সুযোগে সুইজারল্যান্ড ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগও তখন কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এরপর ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রথমে সুইজারল্যান্ড সমতায় ফেরে, পরে তাদের একজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এই দুই ঘটনার পর আর্জেন্টিনা আবারও আক্রমণাত্মক ফুটবলে ফিরে আসে।
গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পরের সময়টিই ছিল আর্জেন্টিনার সবচেয়ে দুর্বল পর্ব। তখন দলটি ধারাবাহিক আক্রমণ তৈরির বদলে দ্বিতীয় বল জয়ের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। যদিও জুলিয়ান আলভারেজকে আগের ম্যাচগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় দেখা যায়। তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করেছেন, বলের জন্য লড়াই করেছেন এবং বেশ কয়েকবার বলও কেড়ে নিয়েছেন।
তবে লিড ধরে রাখার চিন্তায় আর্জেন্টিনা অনেকটা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় সুইজারল্যান্ডের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে পারেনি তারা।
এই সময়ে মাঝমাঠেও কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। লিয়ান্দ্রো পারেদেস ছাড়া অন্যরা নিজেদের সেরা ছন্দে ছিলেন না। এনজো ফার্নান্দেজ ও রদ্রিগো দি পল স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেননি। আক্রমণে মাঝমাঠ থেকে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন ম্যাক অ্যালিস্টার।
তবে সুইজারল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর আর্জেন্টিনা নিজেদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনে। কোচ লিওনেল স্কালোনি ছয়টি পরিবর্তনের মধ্যে চারটিতেই আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় মাঠে নামান।
নিকোলাস গঞ্জালেস মাঠে নামেন নিকোলাস তালিয়াফিকোর বদলে, লাওতারো মার্তিনেস আসেন রদ্রিগো দি পলের জায়গায়, থিয়াগো আলমাদা নামেন এনজো ফার্নান্দেজের পরিবর্তে এবং ফ্লাকো লোপেজ মাঠে আসেন লিয়ান্দ্রো পারেদেসের জায়গায়।
প্রতিপক্ষ ১০ জনের হয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনার আক্রমণে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। তবে বিশ্বকাপের আগের ম্যাচগুলোই দেখিয়েছে, একজন কম নিয়েও কোনো দল দ্রুত আক্রমণে গিয়ে ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা, যেখানে শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে হয়েছিল তাদের।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল জুলিয়ান আলভারেজের গোল পাওয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আবারও জালের দেখা পান এই ফরোয়ার্ড। পাশাপাশি বদলি হিসেবে নেমে লাওতারো মার্তিনেসও গোল করেন এবং দলের জয় নিশ্চিত করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার গোলটি পেনাল্টি থেকে আসেনি।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে গোলের জন্য শট নেওয়ার ক্ষেত্রে। বিশ্বকাপের শুরুতে আর্জেন্টিনার আক্রমণ অনেকটাই মেসিনির্ভর ছিল। তখন দলের বেশিরভাগ আক্রমণ ও শটের দায়িত্ব ছিল আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকার ওপর।
প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনার ২২টি শটের মধ্যে ১৩টিই নিয়েছিলেন মেসি। সেখানে লাওতারো মার্তিনেসের শট ছিল মাত্র একটি এবং জুলিয়ান আলভারেজের দুটি।
কিন্তু সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। মেসি চারটি শট নিয়েছেন, ম্যাক অ্যালিস্টারও চারটি। আলভারেজ তিনটি, থিয়াগো আলমাদা তিনটি, লাওতারো দুটি, লিসান্দ্রো মার্তিনেস দুটি, নিকোলাস গঞ্জালেস দুটি এবং মলিনা ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরো একটি করে শট নিয়েছেন।
ম্যাচে স্কালোনির একটি কৌশলও নজরে এসেছে। যদিও এটি তার মূল পরিকল্পনার অংশ নয়, তবে মেসি যখন কিছুটা নিচে নেমে ডান দিকে খেলেছেন, তখন জুলিয়ান আলভারেজ আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকায় খেলতে পেরেছেন। একই সঙ্গে লাওতারো মার্তিনেসও বক্সের ভেতরে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে এই বিষয়গুলোই আর্জেন্টিনাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। কারণ বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, প্রতিপক্ষের কঠিনতাও বাড়ছে। এবার তাদের সামনে ইংল্যান্ড—যে দলটি সুইজারল্যান্ডের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে অপেক্ষা করছে।