১৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৫

ইংল্যান্ড দলে বিবাদের গুঞ্জন, কোচের সমালোচনায় তারকা ফুটবলার

জুড বেলিংহ্যাম   © টিডিসি ফটো

বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার পরও ইংল্যান্ড শিবিরে স্বস্তির পাশাপাশি শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পর কোচ থমাস টুখেল ও দলের অন্যতম বড় তারকা জুড বেলিংহামের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন গুঞ্জন। কোচের মন্তব্যের জবাবে বেলিংহামের পাল্টা বক্তব্য ঘিরে ইংল্যান্ডের ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

শনিবার নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠেছে ইংল্যান্ড। তবে ম্যাচের পর দলের পারফরম্যান্স নিয়ে টুখেলের কিছু সমালোচনামূলক মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। বেলিংহামের সেই মন্তব্যই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

নরওয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের লড়াই নিয়ে টুখেলের বিশ্লেষণের প্রতিক্রিয়ায় বেলিংহাম বলেন, ‘হয়তো তিনি জানেন না, এই ধরনের পরিস্থিতিতে আর্লিং হালান্ড, ওডেগার, নুসা ও সরলথের মতো খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলাটা কেমন। এটা সহজে মোকাবিলা করার মতো দল নয়।’

বেলিংহামের এমন মন্তব্য দ্রুতই ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনাম হয়ে ওঠে। তবে দেশটির অনেকেই এটিকে হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। কারণ টুখেল ইংল্যান্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বেলিংহামের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি গ্যারি নেভিল বিষয়টি নিয়ে বলেন, ‘এটা ১২ মাস ধরে চলে আসা একটি বিষয়। তবে টুখেল তাকে কখনো বেঞ্চে বসিয়ে রাখেননি।’

২০২৫ সালের শুরুতে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন জার্মান কোচ থমাস টুখেল। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী দল গড়তে চেয়েছেন। তার কাছে কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত খ্যাতির চেয়ে দলের ভারসাম্য ও সামগ্রিক পারফরম্যান্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত জাতীয় দলের কোচরা দলের বড় তারকাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের সেরা অবস্থায় রাখেন। কিন্তু টুখেলের দর্শন কিছুটা ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, ইংল্যান্ডকে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ জিততে হলে সবাইকে একই পরিকল্পনার মধ্যে থেকে খেলতে হবে।

১৯৬৬ সালে গর্ডন ব্যাংকস, ববি চার্লটন ও জিওফ হার্স্টদের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছিল। সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তিই টুখেলের বড় লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনে বেলিংহামের মতো বড় তারকার সঙ্গেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা নন তিনি।

বেলিংহাম যে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা প্রতিভা, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। নিজের অসাধারণ দক্ষতায় তিনি একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। নরওয়ের বিপক্ষে দুই গোল করে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলতেও বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

তবে জাতীয় দলের হয়ে কিছু সময় তার প্রভাব কম থাকা এবং মাঠে অতিরিক্ত আবেগ দেখানো নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। টুখেলের মতে, বেলিংহামের আচরণ কখনো কখনো দলের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ কারণেই প্রকাশ্যেই একাধিকবার তাকে সতর্ক করেছেন ইংল্যান্ড কোচ।

২০২৫ সালের জুনে সেনেগালের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ১-৩ গোলের হারের পর বেলিংহামের আচরণ নিয়ে কথা বলেন টুখেল। সে সময় বেলিংহামের মানসিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার মায়ের উদাহরণও দিয়েছিলেন তিনি।

টুখেল বলেছিলেন, ‘তার মধ্যে বিশেষ কিছু আছে, সে বাড়তি কিছু যোগ করে। বড় কিছু অর্জন করতে চাইলে এটা প্রয়োজন। তবে সেটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে হবে, সতীর্থদের ভয় দেখাতে নয়, তাদের সঙ্গে আগ্রাসী আচরণ করার জন্য নয় কিংবা রেফারিদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার জন্য নয়।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ইংলিশ খেলোয়াড়টির মধ্যে এমন কিছু আবেগ আছে, যা কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর হতে পারে। আমি এটা আমার মায়ের ক্ষেত্রেও দেখি, তিনি টেলিভিশনে তাকে দেখে সবসময় সেই ভালো, ভদ্র ও শিক্ষিত ছেলেটিকে দেখতে পান না, যাকে আমি দেখি। সে জিতলে হাসে। কিন্তু মাঝে মাঝে তার রাগ ও আগুন দেখা যায়। টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা আমার মায়ের কাছে এটি বিরক্তিকর মনে হয়।’

পরে নিজের মন্তব্যের জন্য ভাষাগত ভুলের কথা উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন টুখেল। তবে বেলিংহামের আচরণ ও দলের প্রতি তার দায়িত্ববোধ নিয়ে কোচের অবস্থান বদলায়নি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচের জন্য দল ঘোষণার সময়ও বেলিংহামকে বাদ দেন টুখেল। তখন কাঁধের অস্ত্রোপচার থেকে ফিরে আসছিলেন এই মিডফিল্ডার। একই সময়ে ফিল ফোডেন ও জ্যাক গ্রিলিশকেও দলে রাখেননি তিনি।

নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে টুখেল বলেছিলেন, ‘আমি নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের ওপর একটি তথ্যচিত্র দেখছিলাম। সেখানে একটি কথা ছিল—‘আমরা সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের একত্র করি না, আমরা একটি দল তৈরি করি।’ আমি এ কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত। আমরা ঠিক সেটিই করার চেষ্টা করছি।’

এরপর নভেম্বরের ম্যাচে বেলিংহাম দলে ফিরলেও তার আচরণ নিয়ে আবার কথা বলেন টুখেল। আলবেনিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ের সময় বদলি হওয়ার পর বেলিংহামের অসন্তুষ্টি নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।

টুখেল বলেন, ‘আমি এটিকে বড় কোনো বিষয় বানাতে চাই না, তবে আচরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে নামা সতীর্থদের প্রতি সম্মান দেখানোও জরুরি। এটি পারস্পরিক দায়িত্ব ও সম্মানের বিষয়।’

বিশ্বকাপ শুরুর আগ পর্যন্ত বেলিংহামের দলে জায়গা নিয়েও এক ধরনের চাপ তৈরি করেছিলেন টুখেল। তিনি বারবার জানিয়েছিলেন, দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতে বেলিংহামকে লড়াই করতে হবে।

বিশ্বকাপের আগে টুখেল বলেছিলেন, ‘তাকে নিজের জায়গার জন্য লড়াই করতে হবে। সে জানে, সে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তবে আমাদের দলে ১৪ বা ১৫ জন খেলোয়াড় আছে, যারা শুরু করার যোগ্য। পরিস্থিতি সবসময় পরিবর্তন হতে পারে।’

বেলিংহামের অনুপস্থিতিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের চার ম্যাচেই জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড। সেই সময় অ্যাস্টন ভিলার মরগান রজার্সের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হন টুখেল। এরপর থেকেই বেলিংহামের ওপর চাপ ধরে রাখতে রজার্সকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।

তবে বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বেলিংহাম নিজেকে আবারও প্রমাণ করেছেন। ছয় গোল ও একটি অ্যাসিস্ট নিয়ে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন তিনি। তারপরও তার পারফরম্যান্স নিয়ে অতিরিক্ত প্রশংসা করতে চান না টুখেল। কারণ তিনি চান, বেলিংহাম যেন দলের কাঠামোর মধ্যে থেকে নিজের সেরাটা দেন।

ক্রীড়া সাংবাদিক হেনরি উইন্টার ২০২৫ সালের শেষ দিকে বলেছিলেন, ‘টুখেল ইতিহাস তৈরি করতে এসেছেন, বন্ধু বানাতে নয়। মানুষের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার অভ্যাস আছে। তবে তার জেতার অভ্যাসও আছে।’