১২ জুলাই ২০২৬, ১৫:৫৪

মাঠে বেশিরভাগ সময় মেসিকে দৌড়তে দেখা যাচ্ছে না কেন?

লিওনেল মেসি  © ফাইল ছবি

মাঠে লিওনেল মেসি হাঁটছেন। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে বেশিরভাগ সময় তাকে দৌড়তে দেখা যাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে, প্রাতঃভ্রমণে বেড়িয়েছেন তিনি। যেন কোনও হেলদোলই নেই। জীবনে কোনো তাড়াও নেই। হিসাব করে দেখা গেছে, যতটা সময় তিনি মাঠে কাটিয়েছেন, তার ৬৩ শতাংশ সময়ই হেঁটে কাটিয়েছেন!

৩৯ বছরের মেসি কী বয়সের ভার সামলাতে পারছেন না? ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ৩৫.৮৭১ কিলোমিটার অতিক্রম করেছেন তিনি। তার মধ্যে ২২.৯৬০ কিলোমিটারে তার গতি ছিল শূন্য থেকে সাত কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। এই গতিতে দৌড়োনো যায় না। অর্থাৎ মেসি দাঁড়িয়েছিলেন বা হেঁটেছেন।

মিশরের বিরুদ্ধে ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পরও ৩-২ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচেও মেসিকে বিশেষ পরিশ্রম করতে দেখা যায়নি। চাপের মুখে ১৩ মিনিটের খেলায় বদলে দিয়েছিলেন ফল! দক্ষতা এবং প্রতিভা মেপে ব্যবহার করছেন। মেসি মাঝমাঠেই থাকছেন ৪৬.৩ শতাংশ সময়। এর মধ্যে আবার ২৩ শতাংশ সময় শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছেন। ৮.৬ শতাংশ সময়ে হালকা জগিংয়ের মতো করেছেন।

আর্জেন্টিনার কোচ লিয়োনেল স্কালোনি কিছুটা পিছন থেকে ব্যবহার করছেন মেসিকে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের থেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। মেসি নিজেও কোনও কোনও সময় জায়গা বদল করে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মেসি জানেন, তিনি যেখানেই থাকুন বিপক্ষের অন্তত দু’জন ফুটবলার তাঁর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবেন। তাতে সতীর্থরা কিছুটা ফাঁকা জায়গা পাবেন।

মেসি মূলত ঘোরাফেরা করছেন মাঝমাঠ থেকে প্রতিপক্ষ বক্সের সামনে পর্যন্ত। কিছুটা মাঠের ডান দিক চেপে। এই জায়গাটিতেই মেসি সবচেয়ে বিপজ্জনক। বল পেলে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে ঢুকে যেতে পারেন অনায়াসে। পায়ের ছোট টোকা বা শরীরের মোচড়ে ছিটকে দিতে পারেন ডিফেন্ডারদের। ভেঙে দেন রক্ষণ সংগঠন। কখনও নিজে গোল করেন। কখনও সুবিধাজনক জায়গায় থাকা সতীর্থকে বল বাড়িয়ে দেন। পছন্দের জায়গায় রাউন্ড অফ ১৬ পর্যন্ত ৯৭ বার বল পেয়েছেন মেসি।

প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার জন্য মেসির কৌশলও নজর এড়ায়নি ফুটবল বিশেষজ্ঞদের। যেমন কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে ডান দিক দিয়ে দ্রুত বল নিয়ে উঠে যান। তাঁকে অনুসরণ করে কাবো ভার্দের প্রায় গোটা ডিফেন্স তখন মাঠের ডান দিকে। এর পর মেসি হঠাৎ দু’পা বাঁ দিকে সরে এসে জায়গা তৈরি করে নেন। আর কে না জানে, মেসির বাঁ পা কতটা বিপজ্জনক।

ফ্রান্সের প্রাক্তন ফুটবলার রাফায়েল ভারানে মেসির বিরুদ্ধে ২১ বার মাঠে নেমেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপে খেলেছেন। রিয়াল মাদ্রিদের হয়েও খেলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘মেসির একটা বিশেষত্ব রয়েছে। ও মাঠের এমন সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, কিছু বোঝা যায় না। ডিফেন্ডারেরা বুঝতেই পারে না কার ওকে আটকানো উচিত। মিডফিল্ডার, সেন্টার ব্যাক আর ফুল ব্যাকের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মেসির এই অফ দ্য বল খেলাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক।’’ 

ভারানে বলেছেন, মেসি কখনই দারুণ পরিশ্রম করে খেলেন না। ফুটবল ভাবনা আর ম্যাচ রিডিং তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠে মেসির গতিবিধি অনুমান করা কঠিন। একইরকম আক্রমণেও মেসির অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। যা সব সময় তাঁর সতীর্থেরাও বুঝতে পারেন না। মেসি যেমন নিজে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে নেন, তেমনই সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেন। অনেক আক্রমণের ক্ষেত্রে মেসি বক্সের বাইরেই থাকেন। তাতে গোলের সামনে প্রতিপক্ষের ফুটবলাররা জটলা করতে পারেন না। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটি এভাবেই হয়েছিল। 

মেসির প্রাক্তন কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছেন, ‘‘মাঠে মেসিকে অধিকাংশ সময় দেখে অলস মনে হয়। হয়তো ওই সবচেয়ে কম দৌড়ায়। কিন্তু পায়ে বল পেলেই মুহূর্তে গোটা মাঠটা জরিপ করে নেয়। কে কোথায় আছে, কার কাছে বল পৌঁছাতে কত সময় লাগতে পারে, নিখুঁত হিসাব করে নেয়। তার পরই আসল কাজটা করে ফেলে।’’

মেসি ঘুরতে ফিরতেই কাজের কাজটা ঠিক করে দেন। আর্জেন্টিনার আক্রমণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মেসির ৭১ শতাংশ দৌড় শেষ হয়ে যায় বক্সের মাথায়। বাকি ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে তিনি বক্সের মধ্যে ঢোকেন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সহকারী কোচ ছিলেন রেনে মিউলেনস্টিন।

তিনি বলেছেন, ‘‘আগের বিশ্বকাপে আমাদের বিরুদ্ধে ম্যাচটায় ৮০ শতাংশ সময় উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিল মেসি! ও ঠিক তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে, যখন বুঝতে পারে ইতিবাচক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কখন সক্রিয় হয়ে উঠবে, এটা শুধু মেসিই জানে।’’

যেমন কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে বক্সের আগে পর্যন্ত দুলকি চালে এগোচ্ছিলেন। বক্সের মুখে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দেন। তাতে ছিটকে যান কাবো ভার্দের মিডফিল্ডার কেভিন পিনা। ঠিক জায়গা তৈরি করে নিয়ে গোলে শট মারেন মেসি।

তরুণ মেসির বিরুদ্ধে বেশ কিছু ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে আর্সেনালের প্রাক্তন ডিফেন্ডার উইলিয়াম গালাসের। তিনি বলেছেন, ‘‘মেসি হাঁটলে বা দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনও ডিফেন্ডার চাইবে না, ও বল পাক। তাই ওর কাছাকাছি থাকতেই হবে। ওর সঙ্গে হাঁটতে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আর ওর কাছে থাকা মানেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলা। কাছে না গেলে তো আটকানোর সুযোগই থাকবে না। নিজের বা কোনও সতীর্থের জন্য সুযোগ তৈরি করতে চায় মেসি। আসলে কী করতে চাইছে বোঝা যায় না।’’

এবারের বিশ্বকাপেও ৬৩ শতাংশ সময়ে মেসির হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকায় বিস্মিত নন ফুটবল বিশেষজ্ঞেরা। মেসি ছোট থেকেই এরকম। অসম্ভব তীক্ষ্ণ ফুটবল মস্তিষ্ক। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী অধিনায়ক।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকার