কুর্তোয়ার বদলে মাঠে নেমে সুযোগ ছিল নায়ক হওয়ার, এক ভুলে বেলজিয়ামের বিদায়ের খলনায়ক ল্যামেন্স
কুর্তোয়ার ইনজুরিতে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নায়ক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সেন্নে ল্যামেন্স। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি ২৪ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। শেষ মুহূর্তে তার এক ভুলেই বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেওয়া বেলজিয়ামের হারের অন্যতম আলোচিত চরিত্র এখন ল্যামেন্স।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়া চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে তার জায়গায় নামেন ল্যামেন্স। তখন ম্যাচের স্কোর ছিল ১-১। সবাই যখন অতিরিক্ত সময়ের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই স্পেনের ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির দূরপাল্লার শট সামলাতে ব্যর্থ হন তিনি। বলটি তার হাত ফসকে সামনে চলে আসে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিকেল মেরিনো রিবাউন্ড থেকে গোল করেন। শেষ পর্যন্ত ওই গোলেই ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে সেমিফাইনালে উঠে যায় স্পেন।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই গোলরক্ষকের জন্য ম্যাচটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে মাত্র তৃতীয় উপস্থিতি। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে লিচেনস্টাইনের বিপক্ষে ৭-০ গোলের জয়ে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে খেলেন তিনি, যেখানে বেলজিয়াম জয় পায় ৫-২ গোলে।
ল্যামেন্স চলতি মৌসুমেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিয়েছেন। তাকে দলে নিতে ইংলিশ ক্লাবটি খরচ করেছে ২ কোটি ১০ লাখ ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৩ কোটি টাকা। ক্লাবটির নিয়মিত একাদশের গোলরক্ষক হওয়ার লক্ষ্য নিয়েই ওল্ড ট্রাফোর্ডে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।
বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুগের একাডেমি থেকে উঠে আসা ল্যামেন্স শুরুতে সেখানে নিয়মিত সুযোগ পাননি। পরে যোগ দেন রয়্যাল অ্যান্টওয়ার্পে। সেখানেই নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কাড়েন তিনি এবং জাতীয় দলের দরজাও খুলে যায় তার জন্য।
তবে ল্যামেন্সের ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল গোলরক্ষক হিসেবে নয়, আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে। তার বাবা সংবাদমাধ্যম নিউসব্লাডকে জানিয়েছিলেন, ‘সে যেকোনো কোণ থেকে সহজেই গোল করতে পারত।’ কিন্তু ছোটবেলা থেকেই গোলরক্ষক হিসেবেও তার দক্ষতা ছিল। শেষ পর্যন্ত হাতে গ্লাভস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
জাতীয় দলে অভিষেকের পর কুর্তোয়ার জায়গায় সুযোগ পাওয়া নিয়ে ল্যামেন্স বলেছিলেন, ‘থিবো কুর্তোয়া সবসময় আমার বড় আদর্শ ছিলেন। ছোটবেলা থেকে তাকে দেখে বড় হয়েছি, কারণ তার সেভগুলো বিশ্বমানের।’
ফুটবলের বাইরেও বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ রয়েছে ল্যামেন্সের। বই পড়তেও ভালোবাসেন তিনি। তার প্রিয় বই ব্রাজিলের লেখক পাওলো কোয়েলহোর লেখা ‘দ্য আলকেমিস্ট’।
নিজের আগ্রহ নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানকে ল্যামেন্স বলেছিলেন, ‘আমি খেলাধুলার বড় ভক্ত। অন্য খেলোয়াড়দের খেলা দেখতে ভালো লাগে। বিশেষ করে তারা কীভাবে প্রস্তুতি নেয় এবং নিজেদের খেলা নিয়ে কীভাবে চিন্তা করে, সেটি দেখতে পছন্দ করি। যেমন এনবিএতে কোবে ব্রায়ান্ট ও লেব্রন জেমসের খেলা।’
এদিকে, বেলজিয়ামের হয়ে কুর্তোয়ার ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত। আগামী বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৩৮ বছর। তিনি জাতীয় দলে থাকবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের গোলপোস্টের বড় দাবিদার হিসেবে ল্যামেন্সকেই দেখা হচ্ছে।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন কুর্তোয়া। দ্বিতীয়ার্ধের ২৫ মিনিটে পানির বিরতির সময় চিকিৎসা নেওয়ার পরও খেলা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যথার কারণে বদলি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চোখে পানি নিয়ে মাঠ ছাড়েন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।
ম্যাচ শেষে নিজের চোট নিয়ে কুর্তোয়া বলেন, ‘আমি কোয়াড্রিসেপসে অনেক ব্যথা অনুভব করছিলাম, তবে গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না। শুধু দূরপাল্লার শটের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কোচ (রুডি গার্সিয়া) আমাকে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তবে কোনো সমস্যা নেই, দল সবকিছুর ঊর্ধ্বে।’
তবে কুর্তোয়ার জায়গায় নেমে ল্যামেন্সের জন্য ম্যাচটি হতে পারত স্মরণীয় এক মুহূর্ত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি ভুলই তাকে বেলজিয়ামের বিদায়ের খলনায়কে পরিণত করে।
অন্যদিকে, স্পেনের জয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন মিকেল মেরিনো। মাত্র দুই মিনিট আগে মাঠে নামা এই আর্সেনাল মিডফিল্ডার ল্যামেন্সের ভুল কাজে লাগিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন।
মেরিনোর জন্য এমন মুহূর্ত অবশ্য নতুন নয়। এর আগে পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেও বদলি হিসেবে নেমে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন তিনি। সেদিনও প্রতিপক্ষের ভুল কাজে লাগিয়ে স্পেনকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন।
স্পেনের হয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গোলের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেরিনো। তিনি বলেন, ‘আমি কেমন অনুভব করছি? আমি খুব খুশি, এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। একবার এমন হবে ভাবিনি, আবারও এমন মুহূর্ত চলে এলো। মনে হচ্ছে কাকতালীয় কিছু নেই, আপনি যদি প্রস্তুত থাকেন, সুযোগ আবার আসবেই। আমি খুব খুশি এবং জীবনের এই মুহূর্ত উপভোগ করছি।’