১০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫২

ম্যাচ শেষে কেন জার্সি বদলান ফুটবলাররা?

জার্সি বিনিময়  © সংগৃহীত

ফুটবল ম্যাচের ফল যাই হোক, শেষ বাঁশির পর একটি দৃশ্য প্রায়ই নজর কাড়ে—প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের জার্সি বিনিময়। বহু বছর ধরে চলে আসা এই প্রথা এখন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সম্মান, বন্ধুত্ব ও খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার অন্যতম প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই জার্সি বিনিময় শুধু সৌজন্যের প্রকাশই নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে স্মরণীয় মুহূর্তের প্রতীক। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মরক্কোকে হারানোর পর ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে তার তৎকালীন প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন সতীর্থ ও মরক্কোর অধিনায়ক আক্রাফ হাকিমির জার্সি গায়ে উদযাপন করতে দেখা গিয়েছিল, যা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

কেন জার্সি বিনিময় করেন ফুটবলাররা?
ফুটবলে জার্সি বিনিময় মূলত পারস্পরিক সম্মান, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক। বড় তারকাদের মধ্যেই নয়, সব পর্যায়ের খেলোয়াড়রাই বিশেষ ম্যাচ, অসাধারণ পারফরম্যান্স বা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে জার্সি বিনিময় করেন।

তবে বিশ্বসেরা তারকাদের জার্সি বিনিময়ই সাধারণত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। অনেক ফুটবলারের কাছে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো কিংবদন্তিদের জার্সি সংগ্রহ করা ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন।

২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় হারের পর কাবো ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া টানেলে মেসির সঙ্গে জার্সি বিনিময় করেন। পরে তিনি বলেন, এই মুহূর্ত তার হৃদয়ে চিরদিন থেকে যাবে।

তারকাদের জার্সি সংগ্রহের নেশা
সময়ের সঙ্গে জার্সি সংগ্রহ অনেক ফুটবলারের কাছে এক ধরনের শখে পরিণত হয়েছে। সাবেক বার্সেলোনা ডিফেন্ডার জেরার্দ পিকে মেসি, আন্দ্রেয়া পিরলো ও ডেভিড বেকহামের মতো কিংবদন্তিদের জার্সি নিয়ে গড়েছেন সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা।

লিওনেল মেসিও একজন আগ্রহী সংগ্রাহক। তার বাড়িতে কাচের বাক্স ও দেয়ালজুড়ে সাজানো রয়েছে অসংখ্য জার্সি। তার সংগ্রহে যেমন ইয়ায়া তোরে ও রাউলের মতো তারকার জার্সি আছে, তেমনি ইউসুফ এল-আরাবি ও অস্কার উস্তারির মতো তুলনামূলক কম পরিচিত ফুটবলারের জার্সিও রয়েছে।

আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড পাওলো দিবালার সংগ্রহেও রয়েছে প্রয়াত ডিওগো জোটা, রোনালদিনিওসহ অনেক তারকার জার্সি। তার সংগ্রহ এত বড় যে একবার ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করে অনুসারীদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছিলেন, এখানে মোট কতটি জার্সি আছে?

জার্সি বিনিময়ের ইতিহাস
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ফুটবলে প্রথম নথিভুক্ত জার্সি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে ১৯৩১ সালে। সে সময় ফ্রান্স ৫-২ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করলে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ফরাসি খেলোয়াড়রা ইংলিশ ফুটবলারদের জার্সি চেয়ে নেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা তাতে সম্মতি দিলে শুরু হয় এই ঐতিহ্য। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো জার্সি বিনিময় বিশ্বমঞ্চে দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে এটি ফুটবলের অন্যতম পরিচিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

ইতিহাসের বিখ্যাত কিছু জার্সি বিনিময়
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত জার্সি বিনিময়গুলোর একটি ঘটে ১৯৭০ বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল ১-০ গোলে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর ব্রাজিল অধিনায়ক পেলে ও ইংল্যান্ড অধিনায়ক ববি মুর মাঠের মাঝখানে আলিঙ্গন করে জার্সি বিনিময় করেন। সেই ছবি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর ম্যাচে দিয়েগো ম্যারাডোনা করেন বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার স্টিভ হজ ম্যারাডোনার সঙ্গে জার্সি বিনিময় করেন। সেই জার্সিটি ২০২২ সালে নিলামে ৯.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়, যা ফুটবল স্মারকের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্য।

জার্সি বিনিময় কি নিয়মতান্ত্রিকভাবে অনুমোদিত?
ফুটবল নিয়মে ম্যাচ শেষে জার্সি বিনিময়ের অনুমতি রয়েছে। সাধারণত প্রতিটি ম্যাচের জন্য খেলোয়াড়দের একাধিক জার্সি দেওয়া হয়—একটি ব্যবহারের জন্য এবং অন্যটি বিকল্প হিসেবে।

খেলোয়াড়রা চাইলে ম্যাচ শেষে সেই জার্সি প্রতিপক্ষ, বন্ধু-স্বজন কিংবা ভক্তদের দিতে পারেন। তবে অতিরিক্ত জার্সির খরচ অনেক সময় খেলোয়াড়দের নিজেদেরই বহন করতে হয়, যা বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ লিগের অনেক ক্লাবে প্রচলিত।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বিভিন্ন ক্লাবের কিট ম্যানেজারদের একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও রয়েছে, যেখানে ম্যাচের আগেই সম্ভাব্য জার্সি বিনিময় নিয়ে সমন্বয় করা হয়।

কখনও কি জার্সি বিনিময়ে না বলেন ফুটবলাররা?
যদিও জার্সি বিনিময় ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি ঐতিহ্য, তবু এটি বাধ্যতামূলক নয়। ব্যক্তিগত পছন্দ, ম্যাচের পরিস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে অনেক খেলোয়াড়ই কখনও কখনও অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এমনই একটি ঘটনার জন্য আলোচনায় এসেছিলেন। জুভেন্টাসে খেলার সময় আতালান্তার জার্মান ডিফেন্ডার রবিন গোসেন্স ম্যাচ শেষে তার জার্সি চেয়েছিলেন। আত্মজীবনীতে গোসেন্স লিখেছেন, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ক্রিস্টিয়ানো, আপনার জার্সিটা কি পেতে পারি? তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই বলেছিলেন, না।

তবে পরে তার সতীর্থ হ্যান্স হাটেবোর একটি রোনালদোর জার্সি কিনে তাকে উপহার দিলে হতাশা কিছুটা কমে যায়। ফুটবল ইতিহাসে জার্সি বিনিময় নিরুৎসাহিত করার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পর ইংলিশ কোচ স্যার আলফ র‍্যামজি মাঠে নেমে জর্জ কোহেনকে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের সঙ্গে জার্সি বিনিময় করতে বাধা দেন। 

এমনকি আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার সিলভিও মারজোলিনির কাছ থেকে পাওয়া জার্সিটিও ফিরিয়ে নেন তিনি। ওই ঘটনার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা আর জার্সি বিনিময়ে আগ্রহ দেখাননি। আজও জার্সি বিনিময় ফুটবলের অন্যতম সুন্দর ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের যে বার্তা এই প্রথা বহন করে, সেটিই ফুটবলকে কেবল একটি খেলা নয়, বরং বৈশ্বিক বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।