০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৪১

ট্রাম্পের ফোনকলেই কি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফুটবলারের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল?

ট্রাম্প-ইনফান্তিনো  © টিডিসি ফটো

বিশ্বকাপের মাঝপথে ফিফার এক সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। লাল কার্ড দেখে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের শাস্তি হঠাৎ করেই স্থগিত করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এরপরই সামনে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ফিফা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ স্বীকার করেনি, তবু পুরো ঘটনাকে ঘিরে বিশ্ব ফুটবলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে তারিক মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে স্টাড লাগায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন ফোলারিন বালোগুন। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ম্যাচে তার নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু রোববার ফিফা জানায়, তাদের শৃঙ্খলা বিধির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের পরীক্ষামূলক সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে পারবেন যুক্তরাষ্ট্রের এই স্ট্রাইকার।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের দাবি, ম্যাচের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে বালোগুনের শাস্তি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। এরপরই ফিফা নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘোষণা দেয়। যদিও ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই স্বীকার করেনি যে তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক কোনো প্রভাব ছিল।

ফিফার সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘বড় একটি অন্যায়ের সংশোধন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।’

ফিফার সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র দলের খেলোয়াড়রাও। অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ জানান, অনুশীলনে যাওয়ার পথে বাসে বসেই তারা খবরটি জানতে পারেন। প্রথমে দলের সবাই ভেবেছিলেন এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কোনো ভুয়া খবর।

পুলিসিচ বলেন, ‘অবশ্যই এটি আমাদের জন্য বিশাল আত্মবিশ্বাসের উৎস।’

অন্যদিকে ফিফার এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সব দলের ন্যায্য অধিকার রক্ষা এবং এই টুর্নামেন্ট ও ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতাগুলোতে ফেয়ার প্লের মৌলিক নীতি বজায় রাখতে আমরা সম্ভাব্য সব আইনি পথ পর্যালোচনা করছি।’

বেলজিয়ামের সংবাদপত্র ডি স্টান্ডার্ড জানিয়েছে, দেশটির ফুটবল ফেডারেশন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশি আদালতে (সিএএস) যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। আর দলের কোচ রুডি গার্সিয়া পুরো ঘটনাকে 'এপ্রিল ফুলের কৌতুকের মতো' বলে মন্তব্য করেছেন।

ফিফার শৃঙ্খলা বিধির ৬৬.৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকবেন। তাই আপিলের সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বালোগুনের ট্যাকলটি অনিচ্ছাকৃত ছিল এবং যার ওপর ফাউল হয়েছিল, সেই তারিক মুহারেমোভিচ গুরুতর আহত হননি। বিপরীতে এই বিশ্বকাপেই কাতারের আসিম মাদিবোর ট্যাকলে কানাডার ইসমাইল কোনের পা ভেঙে যাওয়ায় তার শাস্তি পাঁচ ম্যাচে উন্নীত করা হয়েছিল। এই দুই ঘটনার পার্থক্যই ফিফার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফক্স নিউজের ভাষ্যকার ক্লে ট্রাভিসসহ কয়েকজন মার্কিন সাংবাদিক দাবি করেছেন, ট্রাম্প নিজেই বালোগুনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা নেন। তার সঙ্গে ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি এবং ব্যবসায়ী স্কট গুডউইন। তাদের নিয়োগ করা আইনজীবীদের একটি দল অভিযোগ তোলে, লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ধীরগতির রিপ্লে ব্যবহারে ত্রুটি ছিল।

ফিফা জানিয়েছে, বালোগুনের শাস্তি পুরোপুরি বাতিল হয়নি; এক বছরের পরীক্ষামূলক সময়ের জন্য তা স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে পারবেন।

বিশ্বকাপ চলাকালে এমন সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বিরল। সর্বশেষ ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি গ্যারিঞ্চার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছিল। সেমিফাইনালে বহিষ্কৃত হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ফাইনালে খেলেন এবং ব্রাজিলকে শিরোপা জিততে সাহায্য করেন। সে সময় স্বাগতিক চিলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে আলেসান্দ্রি ফিফার কাছে হস্তক্ষেপ করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে।

বালোগুনকে ঘিরে নতুন এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই স্বস্তির খবর নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলে নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা বিধির প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।