০৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৭

ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে

ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে  © সংগৃহীত

শেষ বাঁশি বাজতেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখল নরওয়ে। আর্লিং হলান্ডের জোড়া গোলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে ইউরোপের দেশটি। অন্যদিকে ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হলো ব্রাজিলকে।

নিউ জার্সিতে শুরু থেকেই দুই দল সতর্ক ফুটবল খেললেও ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন হলান্ড। তবে নরওয়ের জয়ের নেপথ্যের আরেক নায়ক গোলরক্ষক ওরইয়ান নিল্যান্ড। প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারাইসের নেওয়া পেনাল্টি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে তিনি ব্রাজিলকে এগিয়ে যেতে দেননি। পরে ম্যাচের শেষ দিকে সতীর্থের ডিফ্লেকশনে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা বলও অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

অন্যদিকে একের পর এক সুযোগ তৈরি করেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি ব্রাজিল। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও সেটি শুধু ব্যবধান কমিয়েছে, হার এড়াতে পারেনি। নরওয়ের সংগঠিত রক্ষণ এবং নিল্যান্ডের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে সেলেসাওরা।

ম্যাচের শুরুতে ব্রাজিল পরিকল্পিতভাবে কিছুটা নিচে নেমে খেলতে থাকে। উচ্চ প্রেসিংয়ে না গিয়ে তারা নরওয়েকে বলের দখল রাখতে দেয় এবং বল পেলেই দ্রুত আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে। সেই কৌশল থেকেই ম্যাচের শুরুতে বক্সের ভেতরে মাতেউস কুনিয়াকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। কিন্তু সেই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি ব্রুনো গিমারাইস। নিল্যান্ড ডানদিকে ঝাঁপিয়ে অসাধারণ সেভ করে নরওয়েকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।

শুরুর দিকে খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে না পারলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণের ধার বাড়ায় নরওয়ে। ব্রাজিলও পেনাল্টি মিসের পর কয়েকবার গোলের কাছাকাছি পৌঁছায়, কিন্তু কোনো দলই বিরতির আগে জালের দেখা পায়নি।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। একদিকে আক্রমণ, অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে লড়াই। এই সময়ে মাতেউস কুনিয়াকে তুলে তরুণ স্ট্রাইকার এন্দ্রিককে মাঠে নামান ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

মাঠে নেমেই ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পান এন্দ্রিক। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অসাধারণ পাস থেকে তিনি একেবারে গোলরক্ষকের মুখোমুখি হয়ে যান। কিন্তু নিশ্চিত গোলের সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পেরে বল পোস্টের বাইরে মেরে বসেন। সেই মিসই পরে ব্রাজিলের জন্য বড় আক্ষেপ হয়ে দাঁড়ায়।

এরপর ৬৮ মিনিটে মাঠে নামেন নেইমার। তার মাঠে নামার পর ব্রাজিলের আক্রমণে কিছুটা গতি এলেও গোলের দেখা মেলেনি। বরং ম্যাচের ৭৯ মিনিটে প্রথম আঘাত হানেন আর্লিং হলান্ড। দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে নরওয়েকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।

গোল হজম করার পর সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে ব্রাজিল। কিন্তু সেই সুযোগেই ৯০ মিনিটে আবারও আঘাত করেন হলান্ড। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে দুর্দান্ত এক শটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন নরওয়ের এই স্ট্রাইকার। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় সাতে। ফলে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সমান উচ্চতায় পৌঁছে যান।

যোগ করা সময়ে ব্রাজিল আরেকটি পেনাল্টি পায়। এবার স্পটকিক থেকে গোল করেন নেইমার। তবে সেই গোল কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, ব্রাজিলকে ম্যাচে ফেরাতে পারেনি।

ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আর্লিং হলান্ড ও গ্যাব্রিয়েলের লড়াই। ক্লাব ফুটবলে বহুবার মুখোমুখি হওয়া এই দুই ফুটবলারের দ্বৈরথ জাতীয় দলের জার্সিতেও দেখার অপেক্ষায় ছিলেন সমর্থকেরা।

প্রথমার্ধে অবশ্য সেই লড়াই খুব বেশি জমেনি। উল্লেখযোগ্য প্রথম দ্বৈরথটি হয় ম্যাচের আধা ঘণ্টা পর, যেখানে মাঠে পড়ে যান গ্যাব্রিয়েল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে পুরো দৃশ্যপট পাল্টে দেন হলান্ড। ব্রাজিলের এই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করেই নিজের জোড়া গোল করেন তিনি।

এই হারের পর ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও ম্যাচে সুযোগ সৃষ্টিতে এগিয়ে ছিল ব্রাজিল, কিন্তু ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতা তাদের বিদায়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ম্যাচে ব্রাজিল ১৪টি শট নেয়, যার মধ্যে লক্ষ্যে ছিল মাত্র ৪টি। তাদের প্রত্যাশিত গোল (এক্সজি) ছিল ২ দশমিক ৭৩। অন্যদিকে নরওয়ের এক্সজি ছিল মাত্র ০ দশমিক ৮৪। অর্থাৎ তুলনামূলক কম সুযোগ তৈরি করেও সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছে নরওয়ে, আর সেটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়।

২০২৫ সালের মে মাসে রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব ছাড়ার পর ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ হন কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তার চুক্তির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। তবে এই হতাশাজনক বিদায়ের পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে।

এদিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস গড়েছে নরওয়ে। শেষ চারে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হবে মেক্সিকো ও ইংল্যান্ড ম্যাচের বিজয়ী।