মেসির ঘরের মাঠে খেলবে আর্জেন্টিনা, আত্মবিশ্বাসী দল
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে এবার নিজেদের সবচেয়ে পরিচিত পরিবেশেই মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। ইন্টার মিয়ামির হয়ে নিয়মিত খেলা লিওনেল মেসির ‘দ্বিতীয় ঘর’খ্যাত ফ্লোরিডার মিয়ামিতে কেপ ভার্দের মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। স্থানীয় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, পরিচিত মাঠ এবং দুর্দান্ত ছন্দে থাকা অধিনায়ককে ঘিরে আত্মবিশ্বাসী পুরো আর্জেন্টিনা শিবির।
শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় হার্ড রক স্টেডিয়ামে কেপ ভার্দের বিপক্ষে রাউন্ড অব থার্টিটুর ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে ছয় গোল করা ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি এই ম্যাচেও দলের সবচেয়ে বড় ভরসা।
খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন, তিন বছর আগে মিয়ামিতে আসার পর নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে আবারও শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেবেন মেসি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স তার পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
চলতি বিশ্বকাপে গোল করে মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে গেছেন। এখন তার বিশ্বকাপে গোলসংখ্যা ১৯। একই সঙ্গে তিনি টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েছেন।
কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর ইউরোপ ছেড়ে মেজর লিগ সকারে যোগ দেওয়ার সময় অনেকেই মনে করেছিলেন, মেসি হয়তো ক্যারিয়ারের শেষ সময়টা তুলনামূলক চাপহীনভাবে কাটাতে চান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে তার প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।
ডেভিড বেকহ্যামের সহ-মালিকানাধীন ইন্টার মিয়ামি ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর মেসির আগমনের আগে কোনো শিরোপা জিততে পারেনি। তবে মেসি যোগ দেওয়ার পরই বদলে যায় ক্লাবটির ইতিহাস।
বার্সেলোনার সাবেক সতীর্থ সার্জিও বুসকেতস ও জর্দি আলবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম মৌসুমেই ইন্টার মিয়ামিকে লিগস কাপের শিরোপা এনে দেন তিনি। এরপর গত বছর ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম এমএলএস শিরোপাও জিতিয়েছে মেসির দল।
মেসির প্রভাব শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই। মিয়ামির ফুটবল সংস্কৃতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন।
মিয়ামির কাছের দোরালে অবস্থিত রেভো সকার একাডেমির কোচ হুয়ান পুগিন বলেন, ‘মেসি এখানে ফুটবলের চিত্রটাই বদলে দিয়েছেন। ২০২৩ সালের পর থেকে সবাই ইন্টার মিয়ামির সমর্থক হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একাডেমিতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শিশু ফুটবল শেখার জন্য ভর্তি হচ্ছে।’
মিয়ামিতে বসবাসকারী ৬৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত লিলি দিয়াজও মেসিকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত। চার দশক আগে ফ্লোরিডায় স্থায়ী হলেও জাতীয় দলের প্রতি তার আবেগ এতটুকু কমেনি।
তিনি বলেন, ‘মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে মিয়ামিতে খেলতে আসছেন, এটা আমাদের জন্য দারুণ গর্বের। তিনি শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলার নন, একজন অনুকরণীয় মানুষও।’
আর্জেন্টিনার আরেক সমর্থক ৬২ বছর বয়সী জনি ফোর্টেস শুধু বিশ্বকাপে প্রিয় দলকে সমর্থন দিতেই বুয়েনস আইরেস থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি অফিসে চাকরি করি। কিন্তু এই সফরের খরচ জোগাতে দেড় বছর ধরে রাতে ট্যাক্সি চালিয়েছি। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি, তবে আজ মনে হচ্ছে সব কষ্টই সার্থক।’
মিয়ামির জনপ্রিয় আর্জেন্টাইন রেস্তোরাঁ 'বুয়েনস আইরেস বেকারি'তেও এখন বিশ্বকাপের উন্মাদনা। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ম্যাচ দেখার জন্য সেখানে ১৫ মার্কিন ডলার প্রবেশ ফি এবং ন্যূনতম ২০ ডলার খরচ করার নিয়ম চালু করা হয়েছে।
রেস্তোরাঁয় বসে ম্যাচের অপেক্ষায় থাকা কাতামার্কা প্রদেশের বাসিন্দা জুলিয়ান ফ্রাঙ্কো তিন মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো শহরে স্থায়ী হয়েছেন। মিয়ামিতে এসে তিনি প্রিয় দলের সমর্থকদের সঙ্গে বিশ্বকাপের আবহ উপভোগ করছেন। যদিও তার হাতে ম্যাচের কোনো টিকিট নেই।
মেসিকে নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে ফ্রাঙ্কো বলেন, ‘মেসিকে খেলতে দেখলেই ভেতরে অন্যরকম একটা রোমাঞ্চ কাজ করে। বিশেষ করে এটা ভাবলে যে, সাফল্যের আগে তাকেও অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেসির গল্প আমাদের শেখায়, কোনো ব্যর্থতাই শেষ কথা নয়। নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।’