আনচেলত্তির ছোঁয়ায় যেভাবে বদলে গেলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। চার গোল করে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতার পাশাপাশি মাঠে তার ভূমিকা ও খেলার ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এই বদলের মূল কারিগর ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। রিয়াল মাদ্রিদে যিনি ভিনিসিয়ুসকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার বানিয়েছিলেন, সেই কোচই এবার জাতীয় দলেও তার খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। ফলে নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে ভিনিসিয়ুসকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ব্রাজিল।
চলতি বিশ্বকাপে ভিনিসিয়ুস শুধু গোলই করছেন না, আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ফুটবলও খেলছেন। মাঠে তার অবস্থান বদলে দিয়েছেন আনচেলত্তি। আগে তিনি মূলত বাঁ প্রান্তে উইঙ্গার হিসেবে খেলতেন। এখন তাকে সাইডলাইন ও মাঝমাঠের মাঝামাঝি জায়গায় খেলানো হচ্ছে। এতে তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি কেন্দ্রীয় আক্রমণভাগে ভূমিকা রাখছেন।
এই পরিবর্তনের কারণে ভিনিসিয়ুসকে এখন অনেক বেশি পেছন ফিরে খেলতে হচ্ছে। ফলে তিনি শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করছেন না, বরং দলীয় আক্রমণ গড়ার কাজেও সমান ভূমিকা রাখছেন। আগে তিনি বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে ড্রিবল করে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। এখন তিনি ড্রিবলের পাশাপাশি সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় করে আক্রমণ সাজাচ্ছেন।
এই নতুন ভূমিকায় খেলার ফলে ভিনিসিয়ুস গোলের কাছাকাছি বেশি থাকতে পারছেন। বিশ্বকাপে তার চারটি গোলই সেই পরিবর্তনের প্রমাণ। একই সঙ্গে তিনি বাঁ দিকের ফুলব্যাক ডগলাস সান্তোসকে সামনে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছেন। আবার ভেতরের দিকে দৌড়ে লুকাস পাকেতা কিংবা ব্রুনো গিমারাইসের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ও গড়ে তুলছেন।
তবে শুধু কৌশলগত পরিবর্তনই নয়, আনচেলত্তি ও ভিনিসিয়ুসের পারস্পরিক বোঝাপড়াও ব্রাজিলের জন্য বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। রিয়াল মাদ্রিদে আনচেলত্তির অধীনেই ভিনিসিয়ুস বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ব্যালন ডি'অরের লড়াইয়েও জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। এবার সেই কোচের অধীনেই প্রথমবারের মতো বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নিজের সেরাটা দেখাচ্ছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।
এবারের বিশ্বকাপে শুধু আক্রমণেই নয়, রক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন ভিনিসিয়ুস। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি দুই-তিনবার গুরুত্বপূর্ণভাবে বল পুনরুদ্ধার করেন। এতে তিনি আরও পরিপূর্ণ ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
এর আগে কোপা আমেরিকা কিংবা বিশ্বকাপে নিজের সামর্থ্যের পুরোটা দেখাতে পারেননি ভিনিসিয়ুস। কিন্তু আনচেলত্তির অধীনে এবার সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছেন তিনি।
অবশ্য এই ব্রাজিলকে আগের মতো ঝলমলে বলা যাচ্ছে না। একসময় ব্রাজিলের পরিচয় ছিল ‘জোগো বনিতো’ বা নান্দনিক ফুটবল। এখন সেই সৌন্দর্য খুব বেশি দেখা না গেলেও দলটি আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমষ্টিগত ফুটবল খেলছে।
এই ব্রাজিল আগের মতো প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে জেতে না। তবে দলটি জানে কীভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জিততে হয়। খেলায় আধিপত্য না থাকলেও সুযোগ তৈরি করে গোল করতে পারে। আবার নিজেদের স্বাভাবিক খেলা না হলে ভিন্ন কৌশলও ব্যবহার করছে। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিল প্রতিপক্ষের বক্সে ৫০টিরও বেশি ক্রস করেছিল।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এই নতুন প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা দলটিকে আরও ভয়ংকর প্রতিপক্ষে পরিণত করেছে। আগের মতো চোখধাঁধানো ফুটবল না খেললেও ম্যাচ জেতার নানা উপায় এখন তাদের জানা। আর সেই কারণেই এবারের বিশ্বকাপে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে ব্রাজিলকে দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকেরা।