০১ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৭

মেসির আগুনে ফর্মের সামনে কি টিকবে কেপ ভার্দের ‘লো ডিফেন্সিভ ব্লক’

মেসি ও ভোজিনহা   © টিডিসি ফটো

২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ৩২-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে আগামী শনিবার মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও নবাগত কেপ ভার্দে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা লিওনেল মেসির বিধ্বংসী ফর্মের সামনে মূল পরীক্ষা হবে আফ্রিকান দলটির রক্ষণাত্মক 'লো ডিফেন্সিভ ব্লক' কৌশলের। শক্তির বিচারে দুই দলের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকলেও নিজেদের অভিষেক বিশ্বকাপে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো পরাশক্তিদের রুখে দিয়ে নকআউট পর্বে আসা কেপ ভার্দে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের কঠিন পরীক্ষা নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত। 

তিন ম্যাচে ৬ গোল করে উড়তে থাকা ৩৯ বছর বয়সী মেসির আক্রমণভাগের সাথে মূলত লড়াই হবে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা কেপ ভার্দের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স লাইনের। ৩ জয় নিয়ে দাপটের সাথে রাউন্ড অফ ৩২ তে আসা আর্জেন্টিনার বল পজিশন ও প্রেসিং ফুটবলের বিপরীতে কড়া পাহারার ক্লিন ফুটবল খেলে আরও একটি রূপকথা লিখতে চায় এই ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটি।

ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া কেপ ভার্দের এই সাফল্য কেবল তাদের দেশের জন্যই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ফুটবল রোমান্টিকদের মনে এক অদ্ভুত জাদুর আনন্দ এনে দিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেসনো শহরের সমান মাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার এই দেশটি উরুগুয়ে ও সৌদি আরবকে পেছনে ফেলে ‘এইচ’ গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে। 

এই বিশেষ অর্জন প্রসঙ্গে দলের অন্যতম ভরসা ও গোলরক্ষক ভোজিনহা বলেন, ‘আমার মনে হয় না আমাদের মধ্যে কেউ এমন স্বপ্ন দেখেছিল। তবে আমরা জানতাম আমাদের ভালো খেলার সামর্থ্য আছে। পরের রাউন্ডে কোয়ালিফাই করতে পারাটা আজ আমাদের জন্য অনেক বড় এক স্বীকৃতি। আর্জেন্টিনা আর মেসির বিপক্ষে খেলা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই একটা স্বপ্ন।’

সৌদি আরবের সাথে শেষ ম্যাচে ০-০ ড্র করার পর ড্রেসিংরুমে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়েরা যখন জানতে পারেন যে অন্য ম্যাচের ফলাফলে তারা পরের রাউন্ডে চলে গেছেন, তখন তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। সেই অনুভূতির কথা প্রকাশ করে মিডফিল্ডার ডেরয় ডুয়ার্তে বলেন, ‘আমার প্রায় কান্নাই চলে আসছিল। এটি দারুণ এক আবেগের মুহূর্ত ছিল। সবাই কেবল অপেক্ষা করছিল, প্রার্থনা করছিল এবং আশা করছিল যেন ফলাফল আমাদের পক্ষে আসে। এটি খুবই বিশেষ একটি মুহূর্ত ছিল, যা আমি মাঠে আগে কখনো অনুভব করিনি। আশা করি, পরের ম্যাচেও আমরা একই অনুভূতি ফিরে পাব।’

কেপ ভার্দে দলটি মূলত আন্ডারডগেরও আন্ডারডগ, কারণ তাদের ২৬ সদস্যের দলের খেলোয়াড়েরা গত মৌসুমে ১৪টি ভিন্ন দেশের ২৬টি আলাদা ক্লাবে খেলেছেন, যার মধ্যে বড় কোনো ক্লাবের ফুটবলার নেই বললেই চলে। অথচ এই সাধারণ দলটিই গ্রুপ পর্বে স্পেনের ২৭টি শটের আক্রমণকে কোনো ফাউল ছাড়াই রুখে দিয়ে তাদের ইস্পাতকঠিন ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছে। 

আবার উরুগুয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-২ গোলে ড্র করার ম্যাচে তারা দেখিয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। ম্যাচ শেষে মাস্টারমাইন্ড গোলরক্ষক ভোজিনহা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমরা এখানে শুধু ড্র ধরে রাখতে আসিনি। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার পর থেকে আমরা সবসময় ম্যাচটি জেতার চেষ্টা করেছি। আমরা জানতাম কাজটা সহজ হবে না, কারণ সৌদি আরবও অনেক মানসম্পন্ন দল। আমরা গোল করার সবরকম চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি।’

ফিফার দল সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ করার এই নতুন নিয়মটি মূলত কেপ ভার্দে বা কুরাসাওয়ের মতো দেশগুলোর জন্যই আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, যা ফুটবল বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধে আরও ছোট ও গর্বিত করে তুলেছে। এই আসর থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য নিজেদের দেশের ফুটবলারদের আইডল হিসেবে তৈরি করার স্বপ্ন দেখছেন ভোজিনহা, যিনি বলেন, ‘যা কিছু ঘটেছে তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। আমরা এখানে এসেছি নতুন প্রজন্মের জন্য স্মৃতি তৈরি করতে এবং তাদের সামনে আইডল বা রোল মডেল হিসেবে দাঁড়াতে। কে জানে? এখন থেকে হয়তো কেপ ভার্দের নিজস্ব রোল মডেল তৈরি হবে, কেপ ভার্দের এমন ফুটবলার তৈরি হবে যাদের দিকে তাকিয়ে শিশুরা বলবে, এক দিন আমি ডিফেন্ডার স্টোপিরা, মিডফিল্ডার রায়ান মেন্দেস বা অন্য কেপ ভার্দে খেলোয়াড়দের মতো হতে চাই। এটি সত্যিই অসাধারণ এক প্রাপ্তি।’

ফুটবল যে মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং ছোট দেশগুলোই যে বিশ্বকাপকে জমিয়ে তোলে, সেই সত্যটিই এবার প্রমাণ করেছে 'দ্য ব্লু শার্কস' খ্যাত কেপ ভার্দে। আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধেও ডুয়ার্তে তাই কোনো ভয় না পেয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘আমরা উরুগুয়ে এবং স্পেনের বিপক্ষের ম্যাচগুলোতেও দেখেছি যে আমরা বিভিন্ন দেশের নানা মানুষের কাছ থেকে প্রচুর সমর্থন পেয়েছি। ফুটবল আসলে এটাই করে। ফুটবল মানুষকে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। আমার মনে হয় এটি কেপ ভার্দের সংস্কৃতিরও অংশ; আমরা মানুষকে স্বাগত জানাতে ভালোবাসি, অন্যকে আপন করে নিতে ভালোবাসি। এটিই কেপ ভার্দের খাঁটি বৈশিষ্ট্য এবং এটি আমাদের গর্বিত করে।’ 

আগামী শনিবার আর্জেন্টিনার বিশ্বমানের স্কোয়াডের বিপক্ষে নিজেদের পুরোটা উজাড় করে দিতে তৈরি ডুয়ার্তে আরও যোগ করেন, ‘অবশ্যই এটি একটি বিশেষ মুহূর্ত, বিশেষ ম্যাচ। তবুও বল তো গোল, আর আপনারা দেখেছেন যে আমরা যখন স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে খেলেছি, ম্যাচ ড্র হয়েছে। তাহলে এবার কেন নয়? মাঠ থেকে যে আনন্দ আমরা পেয়েছি, তা আমি আগে কখনো অনুভব করিনি। আশা করি আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও আমি এই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি করতে পারব।’