গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর পদত্যাগ করলেন উরুগুয়ের কোচ বিয়েলসা
২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর উরুগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্সেলো বিয়েলসা। দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজের বিদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার কারণ, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ, ফার্নান্দো মুসলেরা ও ফেদেরিকো ভালভার্দেকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া নানা আলোচনার ব্যাখ্যা দেন।
বিশ্বকাপে উরুগুয়ের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়, খেলোয়াড়রা নাকি কোচকে কৌশল পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিলেন। তবে বিয়েলসা সেই দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাকে একটু বিস্তারিত বলতে হবে। কৌশল পরিবর্তনের বিষয়ে যদি বলেন, তাহলে আমার উত্তর হচ্ছে—না। এমন কিছু ঘটেনি। যদি ঘটত, তাহলে সেটি খেলোয়াড়দের জন্য ভালো কিছু হতো না। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু হয়নি। স্পেনের বিপক্ষে আমাদের ম্যাচ দেখলেই বোঝা যায়, আমরা আমার ধারণা অনুযায়ীই খেলেছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার দর্শন একই ছিল। এখন সেটি ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, সেটি আলাদা বিষয়।’
যদিও কৌশল পরিবর্তনের কোনো দাবি ছিল না, তবে খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে দুটি অনুরোধ এসেছিল বলে জানান তিনি। প্রথমটি ছিল অনুশীলনে দলকে দুটি ভাগে ভাগ না করা।
বিয়েলসা বলেন, ‘খেলোয়াড়রা আমাকে বলেছিল, তারা আলাদা দুটি দলে অনুশীলন করতে চায় না। তারা একসঙ্গে থাকতে চায়। আমি মনে করেছি, এমন একটি অনুরোধ গ্রহণ করা উচিত। তারা বলেছিল, তারা আরও কাছাকাছি থাকতে চায়। ঐক্য তাদের মধ্যে আগেও ছিল, কিন্তু তারা আরও কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিল। আমি তাদের যুক্তির সঙ্গে একমত হয়েছিলাম এবং আনন্দের সঙ্গেই সেই অনুরোধ মেনে নিয়েছিলাম।’
খেলোয়াড়দের দ্বিতীয় অনুরোধ ছিল দলীয় বৈঠকের সময় কমিয়ে আনা।
তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা চেয়েছিল, বৈঠকের সময় কিছুটা কমানো হোক। আমি সব সময় কেন বেশি সময় ধরে আলোচনা করি, তার ব্যাখ্যা আমার কাছে আছে। কিন্তু তারা সময় কমানোর অনুরোধ করেছিল এবং আমি সেটিও মেনে নিয়েছি।’
জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়ার মুহূর্তটি নিজের জন্য অত্যন্ত কষ্টের বলে উল্লেখ করেন বিয়েলসা। বিশ্বকাপ থেকে অকাল বিদায় নিয়ে হতাশার কথাও খোলাখুলি বলেন তিনি।
বিয়েলসা বলেন, ‘এই বিদায় আমার জন্য খুবই কষ্টের। এই প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার সময় আমি অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। শেষটা খুব খারাপভাবে হলো। আমি অনেক মানুষকে, বিশেষ করে খেলোয়াড়দের, এই যাত্রায় যুক্ত করেছি। তারা অসাধারণ পরিশ্রম করেছে। মানুষ আমার সম্পর্কে কী ভাবল, সেটা বড় বিষয় নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক।’
বিশ্বকাপে ব্যর্থতার দায়ও নিজের কাঁধেই নেন এই আর্জেন্টাইন কোচ।
তিনি বলেন, ‘আমার খেলোয়াড়রা এমন কিছু করেনি, যাতে আমি তাদের পরিচালনা করতে না পারি। আমি তাদের সফল হওয়ার জন্য আমার সামর্থ্যের সব যুক্তি ও দিকনির্দেশনা দিয়েছি। আমাকে নিয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে বা আমি সংবাদমাধ্যমে তথ্য দিয়েছি—এসবের কোনো ভিত্তি নেই। তিন বছরে আমি কখনো কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনের বাইরে কথা বলিনি। খেলোয়াড়দের কাছে নিজের কথা পৌঁছে দিতে আমি কখনো কোনো কর্মকর্তার সাহায্যও নিইনি। আমি শুধু খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কথা শুনেছি এবং প্রয়োজনীয় বিষয় বলেছি। এই সম্পর্ক কখনো কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়ে আমরা দ্বিতীয় পর্বে উঠতে পারিনি। এর জন্য আমার কোনো অজুহাত নেই।’
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে বিরতির সময় গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরাকে বদলি করার ঘটনাও ব্যাখ্যা করেন বিয়েলসা। তার দাবি, এটি ছিল মুসলেরার নিজের সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটি ঘটনা বলব, যা মুসলেরার মহত্ত্বের পরিচয় দেয়। আমার কোচিং জীবনে কখনো কোনো খেলোয়াড় নিজে থেকে বদলি হতে চায়নি। মুসলেরা আমাকে বলেছিল, নিজের ভুলগুলোর কারণে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। সম্ভবত আগের ম্যাচগুলোর ঘটনাও তার মনে ছিল। সে মনে করেছিল, দ্বিতীয়ার্ধে খেললে দলের ক্ষতি হতে পারে। তাই সে নিজেই মাঠ ছাড়তে চেয়েছিল। কারণ তখনও আমাদের সামনে সুযোগ ছিল এবং সে মনে করছিল, নিজের সেরা অবস্থায় নেই।’
মুসলেরার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি অসাধারণ মহত্ত্ব এবং উদারতার পরিচয়। আজকের ফুটবলে এমন ঘটনা খুবই বিরল। যদি তার খেলার মতো শারীরিক অবস্থা না থাকত, তাহলে সে অবশ্যই আমাকে জানাত। কিন্তু ম্যাচের দিন তার জ্বর ছিল না এবং আগের অসুস্থতারও কোনো প্রভাব ছিল না।’
সংবাদ সম্মেলনে ফেদেরিকো ভালভার্দের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার গুঞ্জনও উড়িয়ে দেন বিয়েলসা। স্পেনের বিপক্ষে তাকে দ্রুত বদলি করার সিদ্ধান্তকে তিনি কোচের স্বাভাবিক দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘একজন কোচ ম্যাচের শুরুতে বা চলাকালে খেলোয়াড় বদলি করবেন, এটাই স্বাভাবিক দায়িত্ব। আমি কখনো মনে করি না, ওই সিদ্ধান্তে আমি ভালভার্দেকে বিব্রত করেছি। তার সঙ্গে আমার কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। বরং আমি অন্য যে কোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় তাকে বেশি ছাড় দিয়েছি। কারণ, বছরে সে অনেক ম্যাচ খেলে এবং সে তা প্রাপ্য। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের কাজ শুরু হওয়ার সময় আমি তাকে বলেছিলাম, প্রয়োজন হলে তাকে রাইটব্যাক খেলতে হতে পারে। তখন আমি রিয়াল মাদ্রিদে সেই পজিশনে যাদের বিপক্ষে সে সফল হয়েছে, এমন পাঁচজন সেরা বাম উইঙ্গারের উদাহরণ দিয়েছিলাম। আবার বলেছিলাম, প্রয়োজন হলে উইঙ্গার হিসেবেও খেলতে হতে পারে। অথবা সে তার স্বাভাবিক পজিশনে, অর্থাৎ মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলবে। তখন তার উত্তর ছিল অসাধারণ উদারতার পরিচয়। সে বলেছিল, ‘আপনি আমাকে যে পজিশনে প্রয়োজন মনে করবেন, আমি সেখানেই খেলব।’