গুরু বনাম শিষ্যের লড়াই: ব্রাজিলের ফুটবল-দর্শন দিয়েই ব্রাজিলকে বধ করতে চায় জাপান
২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর মঞ্চে আজ এক ঐতিহাসিক গুরু বনাম শিষ্যের লড়াই দেখবে ফুটবল বিশ্ব। হিউস্টনের মাঠে আজ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হচ্ছে চারবারের এশিয়ান কাপজয়ী জাপান। তবে জাপানি ফুটবলের জন্য এই ম্যাচটি কেবলই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়; এটি তাদের ফুটবলের ‘গুরু’ তথা মেন্টরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক মহাপরীক্ষা। খবর রয়টার্সের
বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছিল হাজিমে মোরিয়াসুর দল। গত চার বছরে জার্মানি, স্পেন এবং ইংল্যান্ডের মতো বিশ্বসেরা দলগুলোকে হারিয়ে সামুরাই ব্লু-রা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে বিশ্বমঞ্চে যেকোনো পরাশক্তিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য তাদের রয়েছে। তবে আজ হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে তাদের সামনে যে বাধা, তার শিকড় জড়িয়ে আছে জাপানি ফুটবলের উত্থানের ইতিহাসের সাথে।
জে-লিগ এবং ব্রাজিলের অন্তহীন প্রভাব
১৯৯৩ সালে যখন জাপানের পেশাদার ফুটবল লিগ ‘জে-লিগ’ (J-League) যাত্রা শুরু করে, তখন তারা কেবল ব্রাজিলের ফুটবল-দর্শনকেই অনুপ্রেরণা হিসেবে নেয়নি, বরং ব্রাজিলের অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলারকে নিজেদের লিগে উড়িয়ে এনেছিল।
১৯৮২ বিশ্বকাপের ব্রাজিলের জাদুকরী মিডফিল্ডার জিকো তাঁর অবসর ভেঙে যোগ দিয়েছিলেন জাপানের কাশিমা অ্যান্টলার্সে। এরপর বিসমার্ক, ইলিভেলতনের মতো তারকারা জাপানি ফুটবলে যোগ দেন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে, ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক দুঙ্গাসহ মোট সাতজন তারকা ফুটবলার জাপানের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই জাপানি ফুটবলারদের মানসিকতা ও খেলার ধরন গড়ে উঠেছে এই ব্রাজিলিয়ানদের হাত ধরেই।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলা সেসার সাম্পাইও, যিনি নিজেও জাপানের ইয়োকোহামা ফ্লুগেলসে খেলেছেন, তিনি রয়টার্সকে বলেন:
"যারা জাপানি ফুটবলকে নিয়মিত অনুসরণ করে না, তারা আজ চমকে যেতে পারে। কিন্তু আমি অবাক নই। আমি যখন ওখানে খেলতাম, তখনই দেখেছি জাপান প্রতি বছর ধাপে ধাপে উন্নতি করছে। তাদের শৃঙ্খলা বরাবরই অসাধারণ। আর এখন তাদের দলে মায়েদা ও উয়েদার মতো দুর্দান্ত সব খেলোয়াড় আছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটিই হবে তাদের আসল পরীক্ষা।"
‘মিরাকল ইন মিয়ামি’ এবং ঐতিহাসিক সুযোগ
বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে মাত্র একবারই দেখা হয়েছিল এই দুই দলের। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে জিকো যখন জাপানের ডাগআউটে প্রধান কোচ হিসেবে বসা, তখন ডর্টমুন্ডের মাঠে ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল জাপান। সেই জাপান দলে খেলেছিলেন আলেসান্দ্রো সান্তোস—যিনি ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীতে জাপানের নাগরিকত্ব নিয়ে বিশ্বকাপে জাপানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ২০১০ বিশ্বকাপে খেলা ডিফেন্ডার মার্কাস তুলিও তানাকাও ছিলেন একই রকম আরেকজন ব্রাজিলিয়ান-জাপানি তারকা।
তবে অলিম্পিক ও প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের জয়ের রেকর্ড রয়েছে। ১৯৯৬ সালের অলিম্পিকে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে স্তব্ধ করেছিল জাপান, যা ফুটবল ইতিহাসে ‘মিরাকল ইন মিয়ামি’ নামে পরিচিত। আর সবচেয়ে বড় কথা, গত বছরের (২০২৫) অক্টোবরে টোকিওতে এক প্রীতি ম্যাচে এই কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলকেই ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছিল মোরিয়াসুর দল।
সাবেক জাপানি ডিফেন্ডার তুলিও তানাকা বলেন, জাপান ও ব্রাজিলের এই ম্যাচটির তাৎপর্য অনেক গভীরে। আমি যখন প্রথম এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট হিসেবে জাপানে আসি, তখন ভাবতাম কবে জাপান ও ব্রাজিল বিশ্বকাপে একদম সমানে সমানে লড়াই করবে। সেই দিনটি ভাবনার চেয়েও অনেক দ্রুত চলে এসেছে। এই টুর্নামেন্টে দুই দলের ব্যবধান এবং খেলোয়াড়দের কন্ডিশন আগের চেয়ে অনেক কাছাকাছি। বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে হারানোর জন্য জাপানের সামনে এটিই জীবনের সেরা সুযোগ।'
গুরু ব্রাজিলের সেই চেনা ছন্দ, গতি আর ‘জোগো বোনিতো’র মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই আজ হিউস্টনের মাঠে সেই গুরুকেই কি স্তব্ধ করে দিতে পারবে শিষ্য জাপান? উত্তর মিলবে আর কিছুক্ষণ পরেই।