জাপানকে নিয়ে সতর্ক আনচেলত্তি—‘এটা ফাইনালের মতোই কঠিন ম্যাচ’
বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের নকআউট পর্বে জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ব্রাজিলের শুরুর একাদশ নিয়ে রহস্য বজায় রেখেছেন প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখছেন না। তার ভাষায়, জাপানের বিপক্ষে এই ম্যাচটি একটি ফাইনালের মতোই কঠিন হবে।
সোমবার (২৯ জুন) টেক্সাসের হিউস্টনে বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট ম্যাচে জাপানের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। ম্যাচের আগের দিন রবিবার (২৮ জুন) সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘জাপান খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি দল। তারা বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ১৭ নম্বরে আছে। মার্চে তারা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে। এটি ফাইনালের মতো একটি ম্যাচ। তারা খুবই শক্তিশালী দল। আমরা জানি, এই ম্যাচ জিততে হলে আমাদের খুব ভালো খেলতে হবে। আমরা এটাও মনে রেখেছি, গত নভেম্বরে জাপান আমাদের হারিয়েছিল। তারা দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ খেলেছিল। অবশ্যই আমরা সেটি মাথায় রেখেছি। আমরা তাদের সম্মান করব এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়েই মাঠে নামব।’
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে একাদশ ঘোষণা করেননি আনচেলত্তি, তবু ধারণা করা হচ্ছে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারানো একই দলকেই তিনি মাঠে নামাবেন। ওই ম্যাচে ব্রাজিল টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছিল।
সবকিছু ঠিক থাকলে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ হবে—অ্যালিসন; দানিলো, মারকুইনহোস, গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালহায়েস, ডগলাস সান্তোস; কাসেমিরো, ব্রুনো গুইমারেস, লুকাস পাকেতা; ভিনি জুনিয়র, রায়ান ও মাতেউস কুনিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, শুরুর একাদশ না জেনে খেলোয়াড়রা ঠিকভাবে ঘুমাতে পারবেন কি না। জবাবে হাস্যরসের আশ্রয় নেন আনচেলত্তি।
তিনি বলেন, ‘ঘুমাবে। আপনি কি মনে করেন খেলোয়াড়রা ভালো ঘুমাতে পারে না? যে খেলবে সে জানে। যে খেলবে না, সে জানে না। এটা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। খেলোয়াড়রা খুব ভালো ঘুমায়। কোচের চেয়েও ভালো ঘুমায়।’
এরপর শুরুর একাদশ প্রকাশের অনুরোধ করা হলে ইতালিয়ান এই কোচ আবারও মজার ছলে উত্তর দেন।
তিনি বলেন, ‘জানি না। আমি এখন একাদশ বলতে চাই না। আমি চাই না আপনারা নিশ্চিন্ত হয়ে যান। আগামীকালের জন্য সেরা একাদশ কী হবে, সেটা আমি ঠিক করব। আমি যদি এখন একাদশ বলে দিই, তাহলে আপনারা সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে যাবেন। আপনাদের কথাও তো আমাকে ভাবতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে নেইমারের বিষয়েও কথা বলেন আনচেলত্তি। দীর্ঘ পুনর্বাসন শেষে ব্রাজিলের এই তারকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ফিট বলে জানান তিনি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নেইমার প্রায় ১৫ মিনিট খেলেছিলেন। জাপানের বিপক্ষে তিনি আরও বেশি সময় মাঠে থাকতে পারেন।
এ বিষয়ে আনচেলত্তি বলেন, ‘নেইমার খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। গত সপ্তাহে সে দারুণ উন্নতি করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, চোটের কারণে পুরো সময় সে আমাদের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারেনি। এখন সে ১৫ মিনিটের বেশি সময় খেলার জন্য প্রস্তুত। তবে সে কতক্ষণ খেলবে, সেটা ম্যাচের পরিস্থিতি এবং খেলার গতির ওপর নির্ভর করবে।’
সবকিছু বিবেচনায় আনচেলত্তি স্কটল্যান্ড ম্যাচের সফল একাদশেই আস্থা রাখবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে তিনি জাপানকে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন। তার লক্ষ্য, এই কঠিন বাধা পেরিয়ে ব্রাজিলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলা।
সংবাদ সম্মেলনে নকআউট পর্বের চাপ নিয়েও কথা বলেন আনচেলত্তি।
তিনি বলেন, ‘এটা দুই লেগের লড়াই নয়, একটি ম্যাচের লড়াই। এখানে ফিরতি ম্যাচ নেই। সৌভাগ্যবশত ব্রাজিলের দলে অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে। তারা জানে এ ধরনের ম্যাচ কীভাবে খেলতে হয়। এই জায়গায় আমি দলের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখি।’
মাতেউস কুনিয়ার পরিবর্তিত ভূমিকা নিয়েও সন্তুষ্ট ব্রাজিল কোচ।
তিনি বলেন, ‘গত ম্যাচে কুনিয়াকে নির্দিষ্ট কোনো পজিশনে না খেলানো আমাদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। আমরা চাইনি প্রতিপক্ষ সহজে বুঝতে পারুক সে কোথায় খেলছে। ব্রুনো, পাকেতা ও কুনিয়া গত দুই ম্যাচে নিজেদের অবস্থান খুব ভালোভাবে পরিবর্তন করেছে।’
জাপান ব্রাজিলকে গুরুত্ব দিচ্ছে না—এমন মন্তব্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন কি না, জানতে চাইলে আনচেলত্তি বলেন, ‘কে কী বলছে, তা নিয়ে আমি ভাবি না। আমরা শুধু প্রতিপক্ষের শক্তি নিয়ে ভাবি। কীভাবে তাদের সমস্যায় ফেলব এবং নিজেরা সমস্যা এড়াব, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। মানসিক খেলা নিয়ে আমরা কাজ করছি না।’
ব্রাজিলের জন্য এই ম্যাচ সহজ হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি একমত নই। প্রতিটি ম্যাচই খুব কঠিন। আমাদের অনেক কিছু ভাবতে হয়, অনেক চাপ থাকে। আমরা শুধু ভালো খেলতে চাই। যদি ভালো খেলতে না পারি, তাহলে আমাদের বাড়ি ফিরে যেতে হবে। এখনো আমি কোনো স্পষ্ট ফেবারিট দেখছি না। কিছু দল গ্রুপ পর্বে অন্যদের চেয়ে ভালো খেলেছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো দলকে আমি এগিয়ে রাখছি না। এটি খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ একটি বিশ্বকাপ।’
ব্রাজিলের ঐতিহ্য প্রতিপক্ষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আনচেলত্তি বলেন, ‘ফুটবল অনেক বদলে গেছে। এখন কোনো দলই অগোছালো নয়। সবাই বিশ্লেষণ করে, সবাই শেখে, সবাই কঠোর পরিশ্রম করে। কোনো দলের ব্যক্তিগত মান কিছুটা কম হতে পারে, কিন্তু অগোছালো বা শারীরিকভাবে দুর্বল দল এখন আর নেই। সবাই লড়াই করে, সবাই ভালো ফুটবল খেলে। সব দলের রক্ষণভাগের সংগঠন এবং খেলার তীব্রতা খুবই ভালো।’
জাপানের খেলার ধরন নিয়েও সতর্ক ব্রাজিল কোচ।
তিনি বলেন, ‘এটি আগামীকালের ম্যাচের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। জাপান যখন প্রেসিং ভেঙে বল বের করে আনতে পারে, তখন তারা খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আমরা ঠিক করছি, কী ধরনের প্রেসিং করব। প্রস্তুতির শুরু থেকেই আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’
শেষে নিজের দলের প্রস্তুতি নিয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন আনচেলত্তি।
তিনি বলেন, ‘দল পুরোপুরি মনোযোগী। আগামীকালের ম্যাচে যা-ই ঘটুক না কেন, আমরা তার জন্য প্রস্তুত। অতিরিক্ত সময় হোক কিংবা টাইব্রেকার—সব পরিস্থিতির জন্যই আমরা প্রস্তুত।’