আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচ কি পাতানো ছিল, সন্দেহ উস্কে দিচ্ছে বেঞ্চের খেলোয়ারদের অঙ্গভঙ্গি
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচ। শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা, বদলি খেলোয়াড়দের বেঞ্চে ধরা পড়া অঙ্গভঙ্গি এবং ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ম্যাচ পাতানোর জোর গুঞ্জন। যদিও দুই দলের কোচই এমন অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।
‘জে’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে ৩-৩ গোলে ড্র করে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া—দুই দলই নিশ্চিত করে শেষ বত্রিশের টিকিট। অন্যদিকে এই ফলের কারণে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় ইরানকে। এমন সমীকরণই ম্যাচটি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিতর্কের পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও। ১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানির কুখ্যাত ‘প্যাক্ট অব গিজোন’-এর ঘটনায় বাদ পড়েছিল আলজেরিয়া। সেই ম্যাচে দুই দলের নিষ্প্রাণ ফুটবল এতটাই সমালোচিত হয়েছিল যে পরে ফিফা গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজনের নিয়ম চালু করতে বাধ্য হয়।
যদিও এবারের ম্যাচে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে কোনো সমঝোতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু ম্যাচের পরিস্থিতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দুই দলই জানত, ড্র করলেই তারা শেষ বত্রিশে উঠবে। অন্যদিকে কোনো এক দল হারলে সেই দলের বিদায় নিশ্চিত হতো এবং সেরা তৃতীয় স্থানধারী হিসেবে ইরানের সামনে খুলে যেত পরের পর্বে ওঠার সুযোগ।
ম্যাচ ২-২ সমতায় থাকার সময় থেকেই সন্দেহ বাড়তে শুরু করে। সে সময় আলজেরিয়া দীর্ঘ সময় বলের দখল ধরে রাখলেও অস্ট্রিয়া কার্যত চাপ সৃষ্টি করা বন্ধ করে দেয়। দুই দলের খেলায় আক্রমণাত্মক মনোভাবও অনেকটাই কমে যায়, যা দর্শকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে আসল নাটক শুরু হয় যোগ করা সময়ে। রিয়াদ মাহরেজ গোল করে আলজেরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দিলে পয়েন্ট তালিকার হিসাব মুহূর্তেই বদলে যায়। সেই ফল ধরে থাকলে অস্ট্রিয়ার বিদায় নিশ্চিত হতো। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই সাশা কালাইদজিচ গোল করে ম্যাচ ৩-৩ সমতায় ফেরান। এই ফলেই শেষ পর্যন্ত দুই দলই নিশ্চিত করে নকআউট পর্বের টিকিট।
মাহরেজের গোলের পর দুই দলের বদলি খেলোয়াড়দের বেঞ্চে কিছু অঙ্গভঙ্গি ক্যামেরায় ধরা পড়ে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে সন্দেহের জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়, গোলটি হওয়ার পর অস্ট্রিয়ার কয়েকজন খেলোয়াড় আলজেরিয়ার ফুটবলারদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়েও জড়িয়ে পড়েন।
ম্যাচ শেষে অবশ্য ম্যাচ পাতানোর সব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন দুই কোচই।
অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক বলেন, ‘স্কোর যখন ৩-৩ এবং শেষ মুহূর্তে যা ঘটেছে, তাতে কেউ ভাবতেই পারে না যে ফলাফলটি পাতানো ছিল। যদি কেউ আমাকে বলত যে এমনটা হতে চলেছে, আমি তাকে পাগল বলতাম। আমি স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করছি। লকার রুমের পরিবেশটা একেবারে উন্মাদনায় পূর্ণ। আমি বহু বছর ধরে কোচিং করাচ্ছি এবং এমন ম্যাচ আগে কখনো দেখিনি।’
ইরানের বিদায় নিয়েও সহানুভূতি প্রকাশ করেন তিনি। রাংনিক বলেন, ‘আমরা দুঃখিত কারণ ইরানের পরের পর্বে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এটাই নিয়ম।’
অন্যদিকে আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তার দল কখনোই ড্রয়ের জন্য খেলেনি। তিনি বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য ছিল সবসময় জেতা। এটা সত্যি যে, দুই পক্ষই প্রায় ১৫ মিনিট ধরে খুব সতর্কভাবে খেলেছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে কেউ ম্যাচটি ড্র করতে চেয়েছিল। এটা ইচ্ছার অভাব বা হারার ইচ্ছা ছিল না, বরং প্রতিপক্ষ কীভাবে খেলছে তা পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের দুর্বলতাগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা বোঝার একটি প্রচেষ্টা ছিল। ৩-৩ স্কোরলাইনই সব বলে দেয়।’
ম্যাচটি নিয়ে বিতর্ক থামেনি। দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ না থাকলেও শেষ মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ, মাঠের আচরণ এবং বেঞ্চের অঙ্গভঙ্গি বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ম্যাচে পরিণত করেছে আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া লড়াইকে।